আদালতের এখতিয়ার বলতে বোঝায় আইনের অধীনে নির্দিষ্ট ধরণের মোকদ্দমা আমলে নেয়া, শুনানি ও নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা সংবিধান এবং আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরণের আদালত রয়েছে এবং প্রতিটি আদালতের নিজস্ব এখতিয়ার রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সকল দেওয়ানী আদালতের দেওয়ানী মোকদ্দমা শুনানি ও নিষ্পত্তির এখতিয়ার রয়েছে, আবার ফৌজদারী আদালতের এখতিয়ার রয়েছে ফৌজদারী অপরাধের বিচার করার। এই নিবন্ধে দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার, প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার
এখতিয়ার বা Jurisdiction অর্থ হলো ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব। এখতিয়ার বা Jurisdiction শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘juris’ অর্থ আইন এবং “dictio” অর্থ “ঘোষণা” বা “বক্তব্য থেকে।‘ সুতরাং, এখতিয়ার বলতে কোন আইনি সত্তার ওপর প্রদত্ত ক্ষমতা বা কর্তৃত্বকে বোঝায়। যেমন- আদালত, সরকার যারা আইন প্রণয়ন, আইন অনুযায়ী বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পন্ন করা।

রেস সাব জুডিস কি? রেস সাব জুডিস ও রেস জুডিকাটার মধ্যে পার্থক্য কি?
আইনি পরিভাষায়, আইনি সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে বিচার কার্য পরিচালনা করার যে ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাকেই আদালতের এখতিয়ার বলে। অর্থাৎ, কোন মোকদ্দমা আমলে নেয়া, শুনানি করা, এবং প্রার্থীত প্রতিকার প্রদানের আইনসম্মত ক্ষমতাকেই এখতিয়ার বলে।
সব শ্রেণির আদালত সব ধরণের মোকদ্দমা বিচার করার এখতিয়ার রাখে না। প্রত্যেক আদালতের আলাদা আলাদা এখতিয়ার রয়েছে। আদালতের এখতিয়ার কতগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, যার মধ্যে রয়েছে: মোকদ্দমার ধরণ, মোকদ্দমাটি দেওয়ানী বা ফৌজদারী কিনা, মোকদ্দমার মূল্য, পক্ষদের বাসস্থান, ঘটনার স্থান ইত্যাদি।
আদালতের এখতিয়ার আছে কিনা তা ঠিক করবে আদালত নিজেই। এমনকি হিলি হাউজিং বনাম আখতারুজ্জামান ৫৪ ডিএলআর (২০০২) ৪৬ মোকদ্দমায় বলা হয়েছে, আইনে বারিত থাকলেও আদালত নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে সে বিষয়ে আদালতের এখতিয়ার আছে কিনা। দেওয়ানী আদালতের কোন মোকদ্দমা বিচার করার এখতিয়ার আছে কিনা নির্ভর করবে দেওয়ানী কার্যবিধির ৬, ৯, এবং ১৫-২৩ ধারার বিধানের ওপর।
দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ারের প্রকারভেদ
নির্দিষ্ট কোন প্রকারভেদ না থাকলেও দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ ও দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭ অনুসারে দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ারকে পাঁচ শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। যথাঃ
- বিষয়গত এখতিয়ার
- আদি বা মূল এখতিয়ার
- আর্থিক এখতিয়ার
- আঞ্চলিক এখতিয়ার ও
- আপিল এখতিয়ার।
বিষয়গত এখতিয়ার বা Subjective Jurisdiction
আদালতের এখতিয়ার নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে মোকদ্দমার বিষয়বস্তু। অনেক সময় বিষয়বস্তুর ধরণের ওপর আদালতের এখতিয়ার নির্ভর করে। অর্থাৎ, মোকদ্দমার বিরোধীয় বিষয়ের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে সেই বিষয় বিচার করার এখতিয়ার আদালতের আছে কিনা। বিষয়গত এখতিয়ার সম্পর্কে দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ ধারায় বিধান অনুসরণীয়। ৯ ধারা অনুযায়ী, আইনে কোথাও স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না হলে সকল দেওয়ানী প্রকৃতির মোকদ্দমা বিচার করার এখতিয়ার দেওয়ানী আদালতের থাকবে। যেমনঃ সন্তানের ভরণপোষণ বা অভিভাবকত্ব পারিবারিক আদালতের বিচারযোগ্য বিষয়বস্তু হলেও বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানকে সাপ্তাহিক নির্দিষ্ট দিনে দেখার চুক্তি ভঙ্গ হলে পিতা তার সন্তানের মায়ের বিরুদ্ধে আদালত মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। কিন্তু মোকদ্দমাটি পারিবারিক আদালত ব্যাতিত সাধারণ দেওয়ানী আদালতে করা যাবে। কেননা এখানে সন্তানকে দেখার পিতার অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে। অধিকার সংক্রান্ত মোকদ্দমা যেকোন দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ারাধীন।
আদি বা মূল এখতিয়ার বা Original Jurisdiction
প্রাথমিকভাবে মোকদ্দমা আমলে নেয়া ও বিচার করার ক্ষমতাকেই আদি এখতিয়ার বলে। অর্থাৎ, প্রাথমিকভাবে মোকদ্দমাটি যে মূল আদালতে দায়ের করা যায়, সেই আদালতের মূল এখতিয়ার আছে বলে ধরা হবে। অন্যভাবে বলা যায়, যে সকল আদালত মূল মোকদ্দমা আমলে নিয়ে বিচার করতে পারেন এবং রায় প্রদান করতে পারেন সেই সকল আদালতের মূল বা আদি এখতিয়ার আছে। যেমনঃ দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭ অনুযায়ী জেলা পর্যায়ে পাঁচ ধরণের আদালত থাকলেও আদি বা মূল এখতিয়ার আছে শুধু তিন ধরণের আদালতের, যথাঃ সহকারি জজ আদালত, সিনিয়র সহকারী জজ আদালত এবং যুগ্ম জেলা জজ আদালত। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে জেলা জজ আদালতের আদি এখতিয়ার রয়েছে,যেমনঃ দেউলিয়া, প্রবেট, ট্রেডমার্ক প্রভৃতি বিষয়ে।
আর্থিক এখতিয়ার বা Pecuniary Jurisdiction
আর্থিক এখতিয়ার বলতে মোকদ্দমার মূল্যমানের ভিত্তিতে কোন মোকদ্দমা বিচার করার এখতিয়ারকে বোঝায়। দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ এর ৬, ১৫ ধারা এবং দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭ এর ১৮, ১৯ ধারায় দেওয়ানী আদালতের আর্থিক এখতিয়ার আলোচনা করা হয়েছে। দেওয়ানী কার্যবিধির ৬ ধারা অনুযানী কোন আদালত তার এখতিয়ার অতিরিক্ত মূল্যমানের মোকদ্দমার বিচার করতে পারবেনা এবং ১৫ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেকটি মোকদ্দমা তার বিচার করার এখতিয়ার সম্পন্ন সর্বনিম্ন আদালতে দায়ের করতে হবে।
দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭ এর ১৯ ধারা অনুযায়ী, যুগ্ম জেলা জজ আদালত ২৫ লক্ষ থেকে অসীম মূল্যমানের মোকদ্দমার বিচার করতে পারবেন। একই আইনের ১৮ ধারার বিধান অনুযায়ী, সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ১৫ থেকে ২৫ লক্ষ পর্যন্ত এবং সহকারী জজ আদালত ১৫ লক্ষ টাকা মূল্যমানের মোকদ্দম্র বিচার করতে পারবে।
আঞ্চলিক এখতিয়ার বা Territorial Jurisdiction
আঞ্চলিক এখতিয়ার হচ্ছে কোন আদালতের আঞ্চলিক সীমানার ভিত্তিতে মোকদ্দমা বিচার করার এখতিয়ার। অর্থাৎ, দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭ এর ১৩ ধারা অনুযায়ী সরকার কর্তৃক নির্ধারিত আঞ্চলিক সীমানার অভ্যন্তরে মোকদ্দমার কারণ উৎপত্তি হয়েছে কিনা বা কোন আদালতের আঞ্চলিক সীমানার ভেতরে মোকদ্দমার কারণ উৎপত্তি হয়েছে তার ভিত্তিতে কোন মোকদ্দমা আমলে নেওয়া বা বিচার করার এখতিয়ারকে আঞ্চলিক এখতিয়ার বলে। দেওয়ানী কার্যবিধির ১৬-২০ ধারায় দেওয়ানী আদালতের আঞ্চলিক এখতিয়ার সম্পর্কে বিধান প্রদান করা হয়েছে। ১৬ ধারার বিধান হচ্ছে, মোকদ্দমার বিষয়বস্তু যেখানে, সেখানে মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে। ১৭ ধারার বিধান হচ্ছে, মোকদ্দমার বিষয়বস্তু ভিন্ন ভিন্ন আদালতের এখতিয়ারাধীন হলে যেকোন একটি আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে। ১৮ ধারার বিধান হচ্ছে। আদালতের এখতিয়ার অনিশ্চিত হলে, যেকোন একটি আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করা যাবে। ১৯ ধারার বিধান অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি বা অস্থাবর সম্পদের ক্ষতিসাধনের মোকদ্দমা মোকদ্দমার বিষয়বস্তু যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানে অথবা ক্ষতিসাধনকারী বা বিবাদী যেখানে অবস্থান করছে, এ দুই স্থানের যেকোন একটি স্থানে দায়ের করা যাবে। ২০ ধারার বিধান অনুযায়ী, ১৬ থেকে ১৯ ধারার অধীন মোকদ্দমা ব্যতিত অন্যান্য ক্ষেত্রে যেখানে মোকদ্দমার কারণ উদ্ভুত হয় বা বিবাদী বসবাস করে সেখানে মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে।
ডিক্রি কাকে বলে? রায় ও ডিক্রির মধ্যে পার্থক্য কি?
আপিল এখতিয়ার বা Appellate Jurisdiction
আপিল হলো নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আবেদন করার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, কোন পক্ষ নিম্ন আদালতের রায়ের বৈধতা ও যৌক্তিকতা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন এবং উচ্চতর আদালতের কাছে ন্যায়বিচারের জন্য আবেদন করতে পারেন। আপিল এখতিয়ার বলতে নিম্ন আদালতের আপিল শুনানির এখতিয়ারকে বোঝায়। জেলা আদালত যুগ্ম জেলা জজ আদালত বা সহকারী জজ আদালতের মতো নিম্ন আদালতের আপিল শোনে। পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত দেওয়ানী বিষয়ে রিভিশনাল এখতিয়ার ও আপিল পরিচালনা করার এখতিয়ার রয়েছে জেলা জজ আদালতের। হাইকোর্ট বিভাগ তার অধীনস্ত জেলা আদালত এবং অন্যান্য ট্রাইব্যুনালের আপিল শুনানি করে।
মোকদ্দমা বিচারে আদালতের এখতিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এখতিয়ার ছাড়া কোন মোকদ্দমা কোন আদালত বিচার করতে পারবেনা। এখতিয়ারবিহীন কোন আদালতে মোকদ্দমা দায়ের হলে তা আদালত ফেরত পাঠাতে পারেন সেই মোকদ্দমা বিচার করার এখতিয়ার আছে এমন কোন আদালতের নিকট। তবে সলেমান বিবি বনাম প্রশাসক, ফারাজিকান্দি কমপ্লেক্স ৪৫ ডিএলআর (১৯৯৩) ৭৩১ মোকদ্দমায় দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার আছে কিনা এটা নামমাত্রভাবে অনুমান করার সুযোগ নেই। একই রকম সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে Nagri Pracharini Sabha v. Vth Addl. District and Sessions Judge, Varanasi মোকদ্দমাতেও। অর্থাৎ, “আদালতের এখতিয়ার নেই” ব্যাপারটি হালকা ভাবে নিয়ে কোন দেওয়ানী মোকদ্দমা বিচারে আদালতের এখতিয়ার কেড়ে নেয়ার সুযোগ নেই। এমনকি হিলি হাউজিং বনাম আখতারুজ্জামান ৫৪ ডিএলআর (২০০২) ৪৬ মোকদ্দমায় বলা হয়েছে, যেখানে আইনের দ্বারা আদালতের এখতিয়ার বারিত করা হয়েছে সেখানেও আদালতের এখতিয়ার আছে কিনা সেটা আদালতই সিদ্ধান্ত নেবে।













