রেস সাব জুডিস নীতিটি আদালতের মোকাদ্দমা সংক্রান্ত একটি নীতি। নীতিটি এসেছে রোমান আইনের সুপরিচিত নীতি lis alibi pendens (dispute elsewhere pending)বা ‘একই বিষয়ে অন্যত্র বিচারাধীন একাধিক মামলা’ নীতি থেকে। রেস সাব জুডিস নীতির উদ্দেশ্যে হলো কোন মোকদ্দমার পক্ষগণ যাতে একই বিষয়ে একাধিক মোকাদ্দমায় জড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, বিচারে জটিলতা সৃষ্টি না হয় তা নিশ্চিত করা।
রেস সাব জুডিস কি?
রেস সাব জুডিস শব্দটি দুটি ল্যাটিন শব্দযোগে গঠিত। রেস Res অর্থ ‘বিষয়’ এবং সাব জুডিস Sub-Judice অর্থ ‘বিচারাধীন’ অর্থ্যাৎ, আদালতে বিচারাধীন কোন বিষয়। এই নীতিটির মূল কথা হলো, একই পক্ষসমূহের মধ্যে, একই বিচার্য বিষয়ে, একই এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে একাধিক মোকাদ্দমা বিচারাধীন থাকতে পারে না। এই নীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে পরবর্তিতে দায়েরকৃত মোকাদ্দমাটি স্থগিত (Stay of Suit) করা হবে। তবে, আদালত চাইলে ন্যায়বিচারের স্বার্থে রেস সাব জুডিসের নীতি প্রয়োগ করা ছাড়াও দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারার অধীন কোন মোকদ্দমা স্থগিত করতে পারে।

দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারার কোথাও রেস সাব জুডিস শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করা না হলেও এখানে বরং Stay of Suit শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে মোকাদ্দমাটি স্থগিত করার কথা বলা হয়েছে। দেওয়ানী কার্যবিধির ১৯০৮ এর ১০ ধারা অনুযায়ী, দাবীকৃত প্রতিকার প্রদানের এখতিয়ার সম্পন্ন বাংলাদেশের যেকোন আদালতে বা সুপ্রিম কোর্টে একই পক্ষসমূহের মধ্যে বা তাদের প্রতিনিধিদের মধ্যে একই বিচার্য বিষয়ে কোন মোকাদ্দমা বিচারাধীন থাকলে পরবর্তিতে দায়েরকৃত মোকাদ্দমাটি আদালত বিচার না করে স্থগিত করবেন। তবে পূর্ববর্তি মোকদ্দমাটি বিদেশী আদালতে দায়েরকৃত হলে বাংলাদেশের কোন আদালতে পরবর্তিতে দায়েরকৃত মোকদ্দমার ক্ষেত্রে রেস সাব জুডিস নীতিটি প্রযোজ্য হবেনা।
রেস সাব জুডিস নীতির উদ্দেশ্য কি?
পক্ষগণ যাতে একই বিষয়ে একাধিক মোকাদ্দমায় জড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, বিচারে জটিলতা সৃষ্টি না হয় সে উদ্দেশ্যেই রেস সাব জুডিস নীতিটি প্রয়োগ করা হয়। রেস সাবজুডিস নীতির উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপঃ
- মামলার বহুত্ব নিবারণ করা রেস সাব জুডিস নীতির প্রধান উদ্দেশ্য। সিদ্দিক মিয়া বনাম ইদ্রিস ৬০ ডিএল আর ২০০৮ ২০ মামলায় আদালত বলা হয়েছে, মোকাদ্দমার কার্যক্রমের বহুত্ব নিবারণ করা এবং বিরোধপূর্ণ সিদ্ধান্ত এড়ানোই দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারার উদ্দেশ্য। একাধিক মোকাদ্দমা থেকে বাদীকে বিরত না রাখলে বা একই বিষয়ে একাধিক মোকাদ্দমা থাকলে ন্যায় বিচারের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
- বিরোধপূর্ণ সিদ্ধান্ত এড়ানো রেস সাব জুডিস নীতির অন্যতম একটি উদ্দেশ্য। একই বিষয়ে পরস্পর বিরোধীন সিদ্ধান্ত থেকে আদালতকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে এই নীতির প্রয়োগ করা হয়।
- একই বিষয়ে একাধিক মোকদ্দমা বিচারাধীন থাকার ফলে সৃষ্ট হয়রানি বা অসুবিধা থেকে পক্ষসমূহকে মুক্ত করা রেস সাব জুডিস নীতির উদ্দেশ্য।
- আদালতের সময়ের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা রেস সাব জুডিস নীতির গুরুত্বপূর্ন একটি উদ্দেশ্য। একাধিক বিষয়ে একাধিক মোকদ্দমা চলমান থাকলে বিচারিক জটিলতা সৃষ্টি হবে। আদালতের গুরুত্বপূর্ণ সময় বিনষ্ট হবে এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা বাঁধাগ্রস্ত হবে। তাই রেস সাব জুডিস আদালতের সময়ের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেয়।
কখন রেস সাব জুডিস নীতি প্রয়োগ করা যাবে?
রেস সাব জুডিস নীতি অনুযায়ী, একই বিচার্য বিষয়ে একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন থাকতে পারেনা। দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারায় অনুসৃত নীতি অনুযায়ী পরবর্তিতে দায়েরকৃত মামলাটি স্থগিত করতে হবে। কখন দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারার রেস সাব জুডিস নীতি প্রয়োগ করা যাবে তা কতগুলো শর্তের ওপর নির্ভর করে। নিচে রেস সাব জুডিস নীতি প্রয়োগের শর্তাবলি আলোচনা করা হলোঃ
- দুটি মামলা থাকতে হবে; পূর্বে দায়েরকৃত বিচারাধীন এবং পরবর্তিতে দায়েরকৃত মামলা। পূর্বে দায়েরকৃত মামলাটি বাংলাদেশের যেকোন আদালতে, সুপ্রিমকোর্টে বিচারাধীন থাকতে হবে।
- উভয় মামলার বিষয়বস্তু প্রত্যক্ষ এবং মৌলিকভাবে একই হতে হবে।
- উভয় মামলার পক্ষসমূহ একই হবে এবং একই স্বত্বের অধীন হতে হবে।
- পূর্বে দায়েরকৃত মামলাটির প্রতিকার দেয়ার এখতিয়ারাধীন আদালতে বিচারাধীন থাকতে হবে। এখতিয়ার বিহীন আদালতে পূর্ববর্তি মামলা বিচারাধীন থাকলেও পরবর্তিতে দায়েরকৃত মামলায় রেস সাব জুডিস নীতি প্রযোজ্য হবেনা। (মিনোসের বনাম হেমা, এআইআর, ১৯৮২ বোম্বে ১৫১)
রেস সাব জুডিস ও রেস জুডিকাটার মধ্যে পার্থক্য
রেস সাবজুডিস ও রেস জুডিকাটার মধ্যে পার্থক্য নিচে আলোচনা করা হলোঃ
| পার্থক্যের ভিত্তি | রেস সাব জুডিস | রেস জুডিকাটা |
| সংজ্ঞা | প্রার্থিত প্রতিকার দেয়ার এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে একই বিচার্য বিষয়ে একই পক্ষসমূহের মধ্যে কোন মামলা বিচারাধীন থাকলে, পরবর্তিতে দায়েরকৃত মামলা স্থগিত করার যে নীতি আদালত অনুসরণ করে তাই রেস সাব জুডিস। | যখন কোন একটি তর্কিত বিষয়ে কোন আদালত চুড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করে, তখন ওই নিষ্পত্তিকৃত বিষয়ে পরবর্তিতে নতুন কোন মামলা দায়ের নিষিদ্ধ করার যে নীতি আদালত অনুসরণ করে তাই রেস জুডিকাটা। |
| ধারা | দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারা। | দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ ধারা। |
| একত্রে শুনানি | আদালত পূর্ববর্তি ও পরবর্তি মামলা একত্রে শুনানি করার আদেশ দিতে পারে। | আদালত পূর্ববর্তি ও পরবর্তি মামলা একত্রে শুনানি করার সুযোগ নেই। |
| প্রযোজ্যতা | পক্ষদ্বয়ের মধ্যে বিচারাধীন সমান্তরাল মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। | চুড়ান্তভাবে নিষ্পত্তিকৃত মোকদ্দমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। |
| বাংলাদেশ ভিন্ন আদালতের প্রযোজ্যতা | বিদেশি আদালতের রায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে না। | বিদেশি আদালতের রায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। |
| সিদ্ধান্ত | পরবর্তি মোকদ্দমা খারিজ করেনা, মোকদ্দমার বিচার স্থগিত করে। | পরবর্তি মোকদ্দমা দায়েরে বাধা দেয় বা মোকদ্দমা খারিজ করে। |













