আইনের প্রয়োগের অন্যতম একটি মৌলিক ধারণা হলো ‘ডিক্রি’। ডিক্রি বলতে আদালত কর্তৃক ঘোষিত একটি আনুষ্ঠানিক ও চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নির্দেশকে বোঝায়। এটি আদালতের একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যা একটি বিশেষ মামলার নির্দিষ্ট দাবি বা বিষয়ে পক্ষসমূহের অধিকার চুড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে।ডিক্রি প্রদানের মাধ্যমে আদালত একটি মামলার উপর তার সিদ্ধান্ত জানায় এবং এটি বাদী এবং বিবাদীর মধ্যে তর্কিত বিষয়টির একটি চূড়ান্ত সমাধান প্রদান করে।
ডিক্রি কাকে বলে?
দেওয়ানী কার্যবিধির ২(২) ধারায় ডিক্রির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। ডিক্রি হচ্ছে আদালতের একটি আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত যা মোকাদ্দমার সমগ্র বা যে কোন বিষয়ে মোকদ্দমার পক্ষসমূহের অধিকার চুড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে। আব্দুল হামিদ বনাম আব্দুল জায়ের ৩৩ ডিএল আর ৩৪১ অনুযায়ী ডিক্রি এমন যে শুধু আরজির মাধ্যমে দায়েরকৃত মোকাদ্দমায় আদালত কর্তৃক প্রদত্ত হয়। সুতরাং, আরজিতে যে প্রতিকার চাওয়া হয়, সেই প্রতিকারের বিষয়ে আদালত মোকাদ্দমার পক্ষসমূহের অধিকার চুড়ান্তভাবে নির্ধারণে যে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রদান করে তাকেই ডিক্রি বলে। পিটিশনে প্রদত্ত কোন সিদ্ধান্ত ডিক্রি বলে গণ্য হবে না বরং সেটি একটি আদেশ।

ডিক্রির সাধারণ বৈশিষ্ট্য
আদালতের সব সিদ্ধান্ত ডিক্রি নয়। আদালতের কোন সিদ্ধান্ত ডিক্রি হতে হলে নিমোক্ত শর্তসমূহ পূরণ হতে হবেঃ
১) সিদ্ধান্তটি আদালত কর্তৃক বিচারিক সিদ্ধান্ত হবে;
২) বিচারিক সিদ্ধান্তটি আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদত্ত হতে হবে;
৩) এমন আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত কোন মোকাদ্দমায় প্রদত্ত হতে হবে;
৪) সিদ্ধান্তটি বিরোধীয় সমগ্র বা যেকোন বিষয়ে মোকাদ্দমার পক্ষসমূহের অধিকার নির্ণয় করবে এবং
৫) নির্ধারিত অধিকারটি অবশ্যই চুড়ান্ত হতে হবে।
ডিক্রির বিষয়বস্তু
দেওয়ানী কার্যবিধির ২০ আদেশের ১ বিধি অনুযায়ী, মোকাদ্দমা শুনানি সমাপ্ত হলে তৎক্ষণাৎ বা পরবর্তি সাত দিনের মধ্যে রায় ঘোষণা করতে হবে। এবং ৫ক বিধি মতে রায় ঘোষণার দিন থেকে পরবর্তি সাত দিনের মধ্যে ডিক্রি ঘোষণা করতে হবে। ঘোষিত ডিক্রিতে নিম্নলিখিতগুলি অন্তর্ভুক্ত থাকবেঃ
- মামলা নম্বর
- পক্ষগুলোর নাম, তাদের নিবন্ধিত ঠিকানা, কে কার বিরুদ্ধে মামলা করেছে, এবং কেন করেছে তার বিবরণ।
- পক্ষগণের দাবী বা আত্মপক্ষের বিবরণ এবং সংক্ষুব্ধ পক্ষকে প্রদত্ত ত্রাণ বা প্রতিকার
- মামলা মোকদ্দমার মোট খরচের পরিমাণ
- রায় ঘোষণার তারিখ, বিচারকের স্বাক্ষর
- ডিক্রির আওতাধীন প্রতিটি পক্ষের জন্য কিছু করা বা নিষেধ করার আদেশ
- সংক্ষিপ্ত কিন্তু চুড়ান্ত অধিকারের ঘোষণা।
সাধারণত ডিক্রি একবার ঘোষিত ও স্বাক্ষরিত হলে কেবলমাত্র দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫২ ধারা বা রিভিউ ছাড়া সংশোধন করা যায় না। ১৫২ ধারার বিধান অনুযায়ী আদালত নিজ উদ্যোগে বা কোন পক্ষের আবেদনক্রমে ঘোষিত ডিক্রিতে কোন করণিক বা গাণিতিক ভুল, আকস্মিক ভ্রান্তি বা বিচ্যুতির কারণে ডিক্রি সংশোধন করতে পারে।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির অধিকারসমূহ কি কি?
ডিক্রি কত প্রকার?
দেওয়ানী কার্যবিধির ২(২) ধারা অনুযায়ী, ডিক্রি তিন ধরণের হতে পারে। যেমনঃ
১) প্রাথমিক ডিক্রি যা চুড়ান্তভাবে মামলা নিষ্পত্তির আগে প্রদত্ত হয় বা অন্তর্বর্তিকালীন ডিক্রি;
২) চুড়ান্ত ডিক্রি, যা মামলা চুড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রদত্ত হয় এবং
৩) আংশিক প্রাথমিক ও আংশিক চুড়ান্ত ডিক্রি।
এছাড়াও আরো কয়েক ধরণের ডিক্রি আছে দেওয়ানী কার্যবিধিতে। যেমনঃ আপস-মিমাংসার মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘সোলে ডিক্রি’, বিবাহ বিচ্ছেদ বা মৃত্যুর কারণ সংক্রান্ত মামলায় ‘শর্তযুক্ত ডিক্রি’ প্রদান করা হয়।
আদালতের কোন সিদ্ধান্তসমূহ ডিক্রি বলে বিবেচিত হবে?
দলিল বাতিলের সিদ্ধান্ত, চুক্তি রদ, চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি ডিক্রির অন্তর্ভুক্ত। সধারণত যেসব সিদ্ধান্ত ২(২) ধারার শর্ত পূরণ করে না, সেসব সিদ্ধান্ত ডিক্রি বলে গণ্য হবে না। তবে ২(২) ধারা অনুযায়ী, ডিক্রির শর্ত পূরণ না করলেও নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত সমূহ ডিক্রি বলে গণ্য হবেঃ
১) আরজি প্রত্যাখ্যান এবং
২) ১৪৪ ধারা অনুযায়ী প্রত্যর্পণ বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত।
এমনকি মোকাদ্দমা বাতিলের সিদ্ধান্ত, তামাদিতে বারিত আপিল খারিজের সিদ্ধান্ত, কোর্ট ফি না দেওয়ায় আরজি খারিজের সিদ্ধান্ত বিভিন্ন মোকাদ্দমায় ডিক্রি হিসেবে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে।
আদালতের কোন সিদ্ধান্তসমূহ ডিক্রি বলে বিবেচিত হবে না?
নিম্নোক্ত বিচারিক সিদ্ধান্তগুলো ডিক্রি হিসেবে গণ্য হবে নাঃ
১) আপিলযোগ্য আদেশ, যেমন- আরজি ফেরতের আদেশ এবং
২) ব্যর্থতার কারণে খারিজ আদেশ, যেমন- শুনানিতে উপস্থিতিতে ব্যর্থতার কারণে মোকাদ্দমা খারিজের আদেশ।
রায় ও ডিক্রির মধ্যে পার্থক্য
রায় বলতে বোঝায় আদালত কর্তৃক মামলার বিচারের পর প্রদত্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। বিচারক মামলার তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে এবং আইনের প্রয়োগে রায় প্রদান করেন। রায়ে মামলার পক্ষ ও বিপক্ষের যুক্তি, আইনি নীতিমালা, এবং বিচারকের মতামত অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে ডিক্রি হচ্ছে আদালত কর্তৃক মামলার বিচারের পর প্রদত্ত আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত যা পক্ষগুলোর অধিকার ও দায়িত্ব চুড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে। নিচে রায় ও ডিক্রির মধ্যে পার্থক্য নিরূপন করা হলোঃ
| পার্থক্যের ভিত্তি | রায় | ডিক্রি |
| সংজ্ঞা | ডিক্রি বা আদেশের যুক্তি হিসেবে বিচারক যে বর্ণনা দেন তাকেই রায় বলে। | ডিক্রি হলো আদালতের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত যা মোকাদ্দমার বিতর্কিত সমগ্র বা যেকোন বিষয় সম্পর্কে পক্ষসমূহের অধিকার চুড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করে। |
| ধারা | দেওয়ানী কার্যবিধির ২(৯) ধারায় রায়ের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। | দেওয়ানী কার্যবিধির ২(২) ধারায় ডিক্রির সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। |
| বক্তব্যের যুক্তি | রায়ের ক্ষেত্রে বিচারককে যুক্তি দেখিয়ে বক্তব্য প্রদান করতে হয়। | ডিক্রির ক্ষেত্রে বিচারককে যুক্তি দেখিয়ে বক্তব্য প্রদান করার প্রয়োজন নেই। |
| প্রকার | চুড়ান্ত | প্রাথমিক, চুড়ান্ত এবং আংশিক প্রাথমিক ও আংশিক চুড়ান্ত। |
| যে আদেশে প্রদত্ত | দেওয়ানী ও ফৌজদারি উভয় মামলায় প্রদত্ত। | দেওয়ানী মামলায় প্রদত্ত। |
| আপিলযোগ্যতা | নেই | আছে |













