রেস জুডিকাটা বা Res Judicata একটি লাটিন শব্দ, যেখানে Res অর্থ বিষয় এবং Judicata অর্থ আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত অর্থাৎ, ‘বিষয়টি বিচার করা হয়েছে’। ফৌজদারি কার্যবিধিতে রেস জুডিকাটার নীতিটি Double Jeopardy বা দোবারা দোষ নামে পরিচিত। রেস জুডিকাটার বিধানটি ল্যাটিন Ubi eadem ratio ibi idem lex et de similibus idem est judicium অর্থাৎ, যখন একই কারণ বিদ্যমান থাকে, তখন একই আইন এবং একই বিষয়গুলির মতো একই রায় দেওয়া উচিত।
রেস জুডিকাটা বা বিচারকৃত সিদ্ধান্ত নীতি (Res Judicata) কি?
আইনি পরিভাষায়, রেস জুডিকাটা নীতি বা বিচারকৃত সিদ্ধান্ত নীতি অনুযায়ী, একটি বিষয় নিয়ে একই পক্ষদের মধ্যে একবার বিচার হয়ে গেলে পুনরায় সেই একই বিষয়ে মামলা করা যাবে না। বাংলাদেশের দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ ধারায় রেস জুডিকাটা নীতিটি ব্যখ্যা করা হয়েছে। বিধান অনুযায়ী, কোন আদালত এমন কোন মামলা বা বিচার্য বিষয়ের বিচার করতে পারবে না যা সরাসরি এবং প্রত্যক্ষভাবে (Directly and Substantially) পূর্ববর্তী কোন মামলার পক্ষগণের মধ্যে বা তাদের স্থলাভিষিক্তদের মধ্যে বিচারে চুড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ, একই পক্ষসমূহের মধ্যে আদালতে চুড়ান্তভাবে নিষ্পত্তিকৃত একটি বিষয়ে নতুন কোন মামলা করা যাবেনা। একটি উদাহরণের মাধ্যমে রেস জুডিকাটা নীতিটি সহজে বোধগম্য হবে। ধরা যাক, বাছেত মজিদের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের দায়ে ক্ষতিপূরণের মামলা করেছে। আদালত মামলাটি মজিদের পক্ষে রায় দিয়েছে। যদি বাছেত পরবর্তিতে মজিদের বিরুদ্ধে পুনরায় একই চুক্তি ভঙ্গের দায়ে ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করে তাহলে আদালত পরবর্তিতে দায়েরকৃত মামলাটি খারিজ করে দেবে। কারণ পূর্ববর্তী ও পরবর্তি মামলার বিচার্য বিষয় এবং পক্ষ সমূহ একই।

মূল মামলার পাশাপাশি হাইকোর্ট ও প্রিভি কাউন্সিলের Execution Proceedings, Probate Proceedings, Insolvency Proceedings Interlocutory Orders এর ক্ষেত্রেও রেস জুডিকাটার (Res Judicata) নীতি প্রযোজ্য হতে পারে। ১৯৯৩ সালের Sulochana Amma v. Narayana Nair মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রেস জুডিকাটা নীতি প্রয়োগের ব্যপকতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেয় যে, রেস জুডিকাটা শুধুমাত্র আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রযোগ হবে তা নয়, বরং ট্রাইব্যুনালের সমস্ত কোয়াসি-বিচারিক প্রক্রিয়াতেও প্রয়োগ হবে।
সাক্ষী কাকে বলে? কে সাক্ষ্য দিতে পারে?
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর ১১ ধারা অনুযায়ী, আদালতের জন্য রেস জুডিকাটার নীতি প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক। এই নীতি অনুযায়ী আদালত পরবর্তীতে দায়েরকৃত মামলাটি খারিজের (Dismissal of Suit) আদেশ দিতে পারে। তবে, দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর পাশাপাশি, রেস জুডিকাটার নীতিটি আরো কতগুলো আইনে বিধৃত করা হয়েছে। যেমনঃ ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ৪০৩ ধারা, সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ এর ৪০ ধারা, সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদ, জেনারেল ক্লজেস এক্ট, ১৮৯৭ এর ২৬ ধারা, ক্রিমিনাল ল এমেন্ডমেন্ট এক্ট, ১৯৫৮ এর ৮ ধারা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ এর ৩১ ধারায় রেস জুডিকাটার বিধান রয়েছে।
রেস জুডিকাটা নীতির শর্তাবলী
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর বিধান অনুযায়ী রেস জুডিকাটা নীতি প্রযোজ্য হতে হলে নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে-
১) এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত এবং চূড়ান্ত রায়
- পূর্ববর্তী মামলার বিচার অবশ্যই একটি এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত (competent court) কর্তৃক পরিচালিত হতে হবে, যার সেই বিষয়টি বিচার করার ক্ষমতা আছে।
- পূর্ববর্তী মামলার রায় চূড়ান্ত (final) হতে হবে, অর্থাৎ আর কোন আপিল (appeal) বা রিভিশন (revision) করার সুযোগ থাকবে না।
রেস জুডিকাটা নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরবর্তি মামলা বিচার করার এখতিয়ার পূর্বের মামলা বিচারকারী আদালতের থাকতে হবে। যদি এমন হয়, যে আদালতে পূর্ববর্তি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে তার বিচার করার এখতিয়ার ছিল না, তবে এখতিয়ার বিহীন আদালতের বিচার ও রায় দ্বারা পরবর্তি মামলা ‘বিচারকৃত সিদ্ধান্ত/ Res Judicata’ দোষে বারিত হবেনা। ১৯৯৬ সালের Sheodan Singh v. Daryao Kunwar মামলায় ভারতের আদালত সিদ্ধান্ত দেয় যে, ‘পূর্ববর্তী মামলা কোনটি তা ঠিক করতে মামলার রায়ের তারিখ বিবেচনা করতে হবে, মামলা দায়েরের তারিখ নয়’।
কোন একটি মামলায় যদি সম্পূর্ণ বে আইনিভাবে কিংবা স্পষ্টত আইনের অপব্যখ্যা করে বিচার সম্পন্ন করা হয় এবং আপিলের মাধ্যমে সেই ভুল রায় ও ডিক্রি সংশোধন করা না হলে বে আইনিভাবে নিষ্পত্তিকৃত বিচার্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও রেস জুডিকাটা হবে। বিচার কার্য অন্যায় ভাবে সম্পন্ন হলে সেক্ষেত্রে আপিলের বিধান থাকার পরেও কোন বিচার কার্য আইন সম্মত হয়েছে কিনা পরবর্তিতে সে প্রশ্ন অবান্তর।
২) একই বিষয়বস্তু
পূর্ববর্তী মামলার বিষয় এবং পরবর্তী মামলার বিচার্য বিষয় একই হতে হবে অথবা একে অপরের অংশ হতে হবে। এর অর্থ হলো দুটি মামলায় একই মূল বিরোধের সমাধান করা হচ্ছে। পরবর্তি যে মামলায় যে বিচার্য বিষয়টি প্রত্যক্ষ এবং মৌলিকভাবে একই সেই বিচার্য বিষয়টি পূর্ববর্তি মামলায় আদালত শুনেছে এবং চুড়ান্তভাবে নিষ্পন্ন করেছে।
সাক্ষী কাকে বলে? সাক্ষী কত প্রকার?
একতরফা ডিক্রির ক্ষেত্রেও রেস জুডিকাটার নীতি প্রয়োগ হবে। এক্ষেত্রে পক্ষগণের মধ্যে পুনরায় মামলা করা যাবে না। তবে, কোন মামলার শুনানির দিন উভয় পক্ষের অনুপস্থিতির কারণে ম্মলা ডিসমিস হলে নালিশের কারণ তামাদির দোষে দূষিত না হলে সেই বিষয়ে পক্ষগণের বিরুদ্ধে মামলা চলবে।
৩) একই পক্ষ
পূর্ববর্তী মামলার পক্ষগুলো এবং পরবর্তী মামলার পক্ষগুলো একই হতে হবে অথবা তাদের স্থলাভিষিক্ত হতে হবে। স্থলাভিষিক্ত বলতে বোঝায় যারা আইনিভাবে পূর্ববর্তী মামলার পক্ষগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে।
কখন রেস জুডিকাটার নীতি প্রযোজ্য হয় না?
রেস জুডিকাটার নীতি নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলোতে প্রযোজ্য হয় নাঃ
১) শর্তাবলী পূরণ না হলে
পূর্ববর্তী মামলা এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে বিচার, একই বিচার্য বিষয়, একই পক্ষ, চূড়ান্ত রায়ের মত আবশ্যিক শর্তাবলী পূরণ না হলে;
২) ভুল বা প্রতারণামূলক রায়
যদি পূর্ববর্তী মামলার রায় ভুল বা প্রতারণামূলক তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয় অথবা যদি পূর্ববর্তী মামলায় গুণাগুণের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার না হলে;
৩) নতুন তথ্য বা প্রমাণ
যদি পরবর্তী মামলায় নতুন তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় যা পূর্ববর্তী মামলায় উপস্থাপন করা হয়নি অথবা যদি পূর্ববর্তী মামলায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয়;
৪) আদেশের পরিবর্তন
যদি পরবর্তী মামলার আদেশটি পরবর্তী মামলার সময় বলবৎ না থাকলে।
অব্যক্ত বা কনস্ট্রাকটিভ রেস জুডিকাটা (Constructive Res Judicata)
বাংলাদেশের দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ ধারার ৪নং ব্যাখ্যায় অব্যক্ত বা কনস্ট্রাকটিভ রেস জুডিকাটা (Constructive Res Judicata) নীতি উল্লেখ করা হয়েছে। কনস্ট্রাকটিভ রেস জুডিকাটা বলতে বোঝায়, যে বিষয় পূর্ববর্তি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন বা বিপক্ষের যুক্তি খণ্ডনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারত বা হওয়া উচিৎ ছিল সেটাও উক্ত মামলার প্রত্যক্ষ ও মূল বিচার্য বিষয় বলে ধরে নিতে হবে। অর্থাৎ, যেখানে পূর্বের মামলায় কোনো পক্ষের পক্ষে এমন যুক্তি ছিল, যা সেই মামলায় উপস্থাপন করা হয়নি, কিন্তু উপস্থাপন করা উচিত ছিল। এমন পরিস্থিতিতে, পরবর্তী মামলায় সেই যুক্তি আর উপস্থাপন করা যাবে না। ধরুন, মামলা ছিল বাড়ির মালিকানা নিয়ে। আদালত রায় দিলেন যে বাড়িটি ক্রেতার। কিন্তু ক্রেতা আদালতে এটা বলেননি যে, বাড়িতে গোপন ত্রুটি আছে। পরে আবার নতুন করে এই গোপন ত্রুটির ভিত্তিতে আরেকটি মামলা দায়ের করা যাবে না । অব্যক্ত বা কনস্ট্রাকটিভ রেস জুডিকাটাকে (Constructive Res Judicata) পরোক্ষ রেস জুডিকাটা বা Indirect Res Judicata বলে।
রেস জুডিকাটা নীতি প্রয়োগের উদ্দেশ্য
রেস জুডিকাটা নীতি প্রয়োগের বেশ কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে।
১) বিরোধ নিষ্পত্তি ও আইনি স্থিতিশীলতা
এই নীতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো আদালতে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ মিটিয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার প্রদান করা। যদি একই বিষয় নিয়ে একই পক্ষদের মধ্যে একাধিকবার মামলা দায়ের করা যায়, তাহলে আদালতের সময় ও সম্পদ অপচয় হবে এবং বিরোধের দীর্ঘসূত্রিতা ঘটবে। রেস জুডিকাটা নীতি এভাবে আইনি স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করে। যখন আদালত কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা দেয়, তখন সেই ফয়সালা সকলের জন্য চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়। এটি আইনি ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দূর করে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
২) পক্ষগুলোর স্বার্থ রক্ষা
এই নীতি পক্ষগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে। যদি একই বিষয় নিয়ে একাধিকবার মামলা দায়ের করা যায়, তাহলে পক্ষগুলো আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। একই বিষয়ে একাধিক মামলার হয়রানি দূর করে রেস জুডিকাটা এই ধরনের ক্ষতি রোধ করে।
৩) জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষা
এই নীতি জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষা করে। দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ জনসাধারণের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে। তাছাড়া, নাগরিক জীবনে ন্যায়বিচার শান্তি অব্যাহত রাখা সরকারের একটি গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্ব। রেস জুডিকাটা দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে জনসাধারণের এই ভোগান্তি দূর করে।
রেস জুডিকাটা নীতি আইনি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নীতি আদালতের সময় ও সম্পদ সাশ্রয় করে, আইনি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে এবং পক্ষগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে।













