ইউনূসের শাসনামলটি টেস্ট ক্রিকেটের ব্যাটসম্যানের মতো প্রোপাগান্ডার বল ঠেকানোর খেলা হয়েছে মাত্র। এটি প্রমাণিত হয়েছে, রাষ্ট্র সংস্কার করে প্রধানমন্ত্রীর ঐশ্বরিক ক্ষমতা মানুষের স্তরে নামিয়ে আনতে চাইলে, অর্থনৈতিক সংস্কার করে ব্যাংক ডাকাতি কমাতে চাইলে, দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে চাইলে, রাষ্ট্র কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন কমাতে চাইলে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি কালচার আর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দলদাস নিয়োগ বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতে চাইলে, দেশ-লুণ্ঠন ও পরভোজী কালচারের সম্মিলিত শক্তি একযোগে উগ্র ইসলামপন্থি তকমা দিয়ে জামায়াত ট্যাবুর কুইক স্যান্ডে ফেলে দেবে; আজন্ম লিবারেল লাইফ স্টাইল ধরে রাখা মানুষদের। ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদ এই বুনো শিকারের মুখে পড়েছেন।
ড. ইউনূসের অর্থ উপদেষ্টা ভঙ্গুর অর্থনীতি জোড়া লাগাতে বেশখানিকটা সফল হয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন। নৌ-উপদেষ্টা শৃঙ্খলা ফিরিয়েছেন নৌ-চলাচলে। আবার কিছু কিছু উপদেষ্টা কাজের চেয়ে কথা বেশি বলেছেন। খুব সম্ভবত অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রার শুরুতেই কালচারাল উইংয়ের সমালোচনার মুখে যোগ্য একজন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পাল্টে অপেক্ষাকৃত দুর্বল একজন উপদেষ্টা নিয়োগে বাধ্য করা ছিল ইউনূসকে দুর্বল করে দেওয়ার কৌশলী রেসিপি।
ওদিকে দেড় দশক ধরে হাসিনার পছন্দে গড়া আমলাতন্ত্রে কিছু পরিবর্তন আনলেও; ইউনূস প্রশাসনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গড়িমসি, ‘বিএনপি’ তো ক্ষমতায় আসবেই, সুতরাং ইউনূসের কথা শুনে কাজ নেই এ রকম আনউইলিং হর্স কাজ করেছে প্রশাসনের অন্দরে। ২০০৮-এর নির্বাচনে বেশির ভাগ জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশপ্রধান ‘আওয়ামী লীগের ঘোড়া হয়ে দৌড়েছিল। নির্বাচনের পরদিন ভোরে প্রতিবেশী দেশ প্রথম ফুলের তোড়া নিয়ে ছুটে গিয়েছিল শেখ হাসিনার কাছে। আর ২০২৬-এর নির্বাচনের আগেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসে মোদির চিঠিতে বিএনপির নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ দেখার আগ্রহ ব্যক্ত করেছিল। ফলে নির্বাচনের আগেই সিভিল মিলিটারি বুরোক্র্যাসির কাছে অন্তর্বর্তী সরকার দুধভাত হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিএনপির অভিষেকের লক্ষ্যে একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
ড. ইউনূসকে ঘিরে উপদেষ্টাদের একটা ক্ষুদ্র উপবৃত্ত তৈরি হয়েছিল। যারা পররাষ্ট্র বিষয় সামাল দিতে অনেকটা অকার্যকর হয়েছেন। ঘুরে-ফিরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হেজেমনি তাদের বরণ করতে হয়েছে। পররাষ্ট্র সম্পর্কের সব ডিম আমেরিকা ও ভারতের ঝুড়িতে না রেখে চীন-পাকিস্তান-তুরস্কের ঝুড়িতে কিছু ডিম রাখতে গিয়ে ভারতের রুদ্ররোষে পড়তে হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে ভারতের একটা অধিকার বোধ রয়েছে বাংলাদেশের ওপর। দিল্লি মনে করে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় সে দেখবে। শেখ হাসিনার দেড় দশকে দিল্লি এই মুরব্বিয়ানা উপভোগ করেছে।
অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কী ধরনের সম্পর্ক হবে, তা নির্ধারণ করেছে দিল্লির সাউথ ব্লক। ভারত তার শত্রুরাষ্ট্র চীন, মুসলমান রাষ্ট্র বলে অত্যন্ত অপছন্দনীয় পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ইউনূস প্রশাসনের সম্পর্ক উন্নয়নে এত ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে যে, ভারতের সেনাপ্রধান হুমকি দিয়ে বসেন, ইউনূসের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নয়, নতুন সরকার আসুক। ইউনূসের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে দিল্লিতে যেতে হয়েছে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মানভঞ্জন করতে। ইউনূসের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এই বাস্তবতা জানতেন বলে, সবসময় ভারত প্রসঙ্গে অত্যন্ত কোমল ভঙ্গিতে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের এস্টাবলিশমেন্ট, মিডিয়া, কালচারাল সোসাইটি মুক্তিযুদ্ধের ধাত্রী মাতা হিসেবে ভারতকে গভীরভাবে ভক্তি করে।
লেখালেখি ও বাক সক্রিয়তায় তারা ভারতের তৈরি করা অভিধানের শব্দ ব্যবহার করে দিল্লিকে আশ্বস্ত করে প্রায় প্রতিদিন। বিএনপিকে ক্ষমতায় আসার আগেই ভারতের অভিধানের শব্দ ব্যবহার করে সিগন্যালিং করতে হয়েছে যে, তারা ভারতের এঁকে দেওয়া লক্ষ্মণরেখার মধ্যেই আছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও জুলাই বিপ্লবীদের ভারতের আগ্রাসনবিরোধী মনোভাব অনুসরণ করায় ইউনূস সরকার বেশ চাপে পড়েছে। দেশের একাংশের মতামতপ্রভাবিত, ভারতীয় মডেলে বিশ্বাসী তথাকথিত ‘আলোকিত সমাজ’ এ কারণে ইউনূসের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, ভারত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম বা হিন্দু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যে ধমক দেবে, জুলাই বিপ্লবে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হাসিনাকে আশ্রয় দেবে—এটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইউনূস কেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে কথা বলবেন না কিংবা হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে ফেরত চাওয়ার দাবি তুলবেন না?
ড. ইউনূস ও তার কিছু উপদেষ্টার সার্বভৌম চিন্তাকে বাংলাদেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠিত আলোকিত সমাজ, ব্যবসায়ী, সিভিল-মিলিটারি বুরোক্র্যাসির সিনিয়র পর্যায়ের লোকরা ও ডিপস্টেট ভারত প্রভুর প্রতি বেয়াদবি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেটি বুঝেই ইউনূস প্রশাসনের যারা নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারে পদপদবি চান, তারা সমঝে চলেছেন। ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত, তারা ঢাকার ভারত ভক্ত কালচারাল সাব-সোসাইটিতে ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন।
ফলে, এ সমাজে টিকে থাকার জন্য তারা শত বছরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ঐতিহ্যকে মেনে নিয়ে লীগের অনুপস্থিতিতে কালচারাল সোসাইটির মন্দের ভালো অপশন বিএনপির কাছে সুদৃষ্টি চেয়েছেন। মহাপরাক্রমশালী প্রতিবেশীকে চটানো তাদের ঘাট হয়েছে। জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই চলে না। আগ্রাসনবিরোধী কালচারাল মুভমেন্টের নেতা হাদি নিহত হওয়ার ঘটনা জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াইয়ের পরিণতি। এ কারণে ইউনূস ও তার উপদেষ্টা পরিষদের শেষ সাত মাস ছিল নেমেসিসের কাছে আত্মসমর্পণের। বাংলাদেশের নিয়তি ভারতের কালচারাল ছায়া উপনিবেশ হয়ে থাকা; এই ট্র্যাজিক সত্যটি পুনর্বার ধরা দিয়েছে ইউনূসের আশা ও আশাভঙ্গের দিনগুলোয়।
আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজমের বছরগুলোয় বিএনপি-জামায়াত নির্যাতন ও নিগ্রহের মুখে কোনোভাবেই ফ্যাসিস্টের পতন ঘটাতে পারেনি। কিন্তু জুলাই বিপ্লবী জেনজিরা ২০১৮-এর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের পথ ধরে ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টের পতন ঘটিয়েছে। ফলে এই আন্দোলনের তরুণদের প্রথমে ভালোবাসলেও পরে ধীরে ধীরে বিএনপি এদের দুধভাতে পরিণত করার চেষ্টা করে। তারা দেখেছে, একাত্তর ও নব্বইয়ে তরুণরা রক্ত এবং ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র এনে দিলে; প্রবীণরা তাদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে নতুন জমিদারি গড়েছেন।

একে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রূপ দিতে পরিবারতন্ত্রের উষ্ণতায় দারা-পুত্র-পরিবার নিয়ে সুখের সংসারে মজেছেন। চব্বিশের বিপ্লবটিতে এর বেশ খানিকটা অন্যথা হয়েছে। ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদে তিনজন বিপ্লবী তরুণ যোগ দিয়েছিলেন। তখন বাংলাদেশের কালচারাল উইংটি এই তরুণদের গান্ধা করে দেওয়ার শতাব্দী পুরোনো ভিলেজ পলিটিকস শুরু করে। ইউনূস কেন মাহফুজকে ব্রেন বিহাইন্ড দ্য রেভল্যুশন বললেন, এই বিপ্লবকে মেটিকিউলাস কেন বললেন; সারাজীবনে প্রথমবার এ শব্দটি শুনেছেন যে কালচারাল মামা; তিনিও এ শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন। পরিবারতন্ত্রের নেপো বেবি এসে বলল, হাঁসের মাংস খাব আমরা, ওয়েস্টিনে যাব আমরা, আসিফ কেন হাঁসের মাংস খেতে ওয়েস্টিনে যাবেন। নেপো বেবির সেন্স অব এনটাইটেলমেন্ট লক্ষ করুন। বাংলাদেশে গদি মিডিয়ার সাংবাদিকরা নাহিদ কেন এত মোটা হলো বলে; ফেসবুকে তাদের কলতলার সখীদের হাসির রোল এনে দিল।
এরা আসলে আওয়ামী লীগের পতনে নিজেদের গণভবনের পিঠাপুলির আসর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিক্ষুব্ধ। শেখ হাসিনার ‘প্রশ্ন নয় প্রশংসা করতে এসেছি’র আসরে তেলাঞ্জলি দিতে না পেরে এত রাগান্বিত গদি মিডিয়ার সাংবাদিক যে, দুধভাতে উৎপাত এই জুলাই বিপ্লবীদের পারলে জল দিয়ে জ্যান্ত গিলে খায় এরা। আর বিএনপির বুকে চিনচিনে আশঙ্কা, লীগের পতনে দেশের একচ্ছত্র মালিক তারা; এই ছেলেগুলোকে দেখে তাই আবদুল্লাহ উপন্যাসের পীরের ভঙ্গিতে প্রডিজি চাইল্ডের উদ্দেশে বলেন, ‘এক ঘরমে দো পীর যাও বাছা শো রাহো।’ ভারতীয় মিডিয়া এই জুলাই বিপ্লবীদের মাথায় ফটোশপ করে জিন্না টুপি পরিয়ে বাংলাদেশ আবার পূর্ব পাকিস্তান হয়ে গেল বলে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে থাকে। এই জুলাই বিপ্লবীদের প্রতি স্নেহ থাকার অপরাধে ইউনূসকে ফটোশপে দাড়ি লাগিয়ে জিন্না টুপি পরিয়েছে তারা। ড. ইউনূস মিডিয়ার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, ভারতীয় মিডিয়া আমাকে তালেবান বলে; আমি মনে হয় বাসায় দাড়ি খুলে এখানে এসেছি।
আওয়ামী লীগ আমলের গুম-ক্রসফায়ার-জুলাই হত্যাযজ্ঞ-সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রামাণ্যচিত্র বানিয়ে ও দ্রুততার সঙ্গে জুলাই জাদুঘর নির্মাণ করে পতিত আওয়ামী লীগ এবং কালচারাল ফ্যাসিস্টদের চক্ষুশূল হয়েছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা সরোয়ার ফারুকী। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ছিলেন নিয়মিত আক্রমণের লক্ষ্য। উপদেষ্টা রেজওয়ানা-ফরিদা ও শারমিন মুর্শিদ অকথ্য সাইবার বুলি সয়েছেন। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানই যেন সবচেয়ে বড় অপরাধ; দৃশ্যত এ রকম মনে হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনা, দেশের রিজার্ভকে শীর্ণ দশা থেকে স্বাস্থ্যবান করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, জ্বালানি সংকট হতে না দেওয়া, ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করে তোলা; ইউনূস প্রশাসনের এসব সুব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের জীবন বেশ খানিকটা স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু এরা তো ফেসবুকে লেখে না কিংবা উপসম্পাদকীয় বা টকশোতে ন্যারেটিভ তৈরি করে না। যারা বয়ান তৈরি করে, তারা হয় আওয়ামী লীগের পতনে হতাশ, অথবা বিএনপির আগমনের অপেক্ষায় অস্থির। আর রয়েছে পা পূজক সম্প্রদায়। যারা হাসিনার পা চলে যাওয়ার পর তারেক রহমানের পা পূজায় ব্যস্ত সমস্ত।
আওয়ামী লীগ আমলে কিছু হিন্দুধর্মীয় নাগরিক সরকারি দলের নেতা হিসেবে গণবিরোধী কর্মকাণ্ড করেছিল; শেখ হাসিনা কিছু হিন্দু পুলিশ ও প্রশাসককে দিয়ে নাগরিক নিগ্রহের কাজ করিয়েছেন; বাংলাদেশে নরেন্দ্র মোদির ‘অখণ্ড ভারত’ কল্পনায় বিভ্রান্ত কিছু হিন্দু ধর্মাবলম্বী ফেসবুকে মুসলমান মানেই জঙ্গি ও রাজাকার তকমা দিয়ে ফ্রেমিং এবং শেমিং করেছে। ফলে হাসিনার পতনের পর তারা কেউ কেউ জনরোষে পড়েছে। ভারতীয় মিডিয়া সেটাকে অতিরঞ্জিত করে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। ভারত থেকে বিজেপির আইডি লীগের এমপি ক্রিকেটার মাশরাফির বাড়িতে ভাঙচুরকে ক্রিকেটার লিটন দাসের বাড়িতে ভাঙচুর, আওয়ামী লীগ মালিকের রেস্টুরেন্টে আগুনকে মন্দিরে আগুন বলে প্রচার করেছে।
এখানেও রয়েছে সেন্স অব এনটাইটেলমেন্ট, ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার গুজরাট, কাশ্মীর, উত্তর প্রদেশ হয়ে বিহার-পশ্চিমবঙ্গ-আসামে মুসলমান নিগ্রহ করে চলেছে; তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিচ্ছে; আর এদিকে বাংলাদেশে তিলকে তাল করে প্রচার করে ইউনূসকে চাপের মুখে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অথচ দুর্গাপূজায় বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা মন্দির পাহারা দিয়েছে; চট্টগ্রামে সন্দেহভাজন হিন্দুত্ববাদী কর্মীর হামলায় আইনজীবী আলিফ হত্যার পর; নিহতের বাবা ছেলের জানাজায় দাঁড়িয়ে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির ডাক দিলে; ড. ইউনূস মন্দিরে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করলে; সেই ইতিবাচক মনোভঙ্গির খবরকে মেইনস্ট্রিম হতে দেয়নি ভারত ও বাংলাদেশের গদি মিডিয়া।
আওয়ামী লীগের সময় মাজারগুলোকে রাজনীতিকীকরণ হয়। এমপি-মন্ত্রীরা প্রধান অতিথি হতেন মাজারের ওরসে। আবার তৌহিদি জনতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, হেফাজতকে নিয়ে শোকরানা মাহফিল করা হয়। মাজারের ধারা ও মসজিদের ধারা উভয়েই চলে জনগণের চাঁদায়। ফলে জুলাই বিপ্লবের পর মসজিদের ধারার লোকরা মাজার ভেঙে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় চাঁদার একচ্ছত্র মালিক হতে চেষ্টা করে। প্রথম দিকের মাজার ভাঙা প্রকল্পে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী ইসলামপন্থিদের অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়; পরে দেশব্যাপী এই ট্রেন্ড ছড়িয়ে পড়লে তখন তৌহিদি জনতার ব্যানারে এই অশুভ কর্মকাণ্ড চলে। পুলিশ বাহিনী দুর্বল থাকায় ইউনূস প্রশাসন এই বিপর্যয় রুখতে পারেনি। তবে মাজার ভাঙার অপরাধে নিয়মিত গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া চাঁদাবাজির সাম্রাজ্যে বিএনপির দখল ও চাঁদাবাজির নৈরাজ্য, সাম্রাজ্য দখলের দ্বন্দ্বযুদ্ধে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড; এসব ব্যাপারে অনুশীলিত নির্লিপ্ততা পালন করে; নির্মূলের রাজনীতির সওদাগররা দাড়ি-টুপি পরা লোকদের পান থেকে চুন খসলেই তা নিয়ে হ্যাশট্যাগের মার্চ পাস্ট শুরু করে। শাহবাগে একটি মেয়েকে ওড়না ঠিক করে পরতে বলে গ্রেপ্তার হওয়া ও চাকরি হারানো যুবকের মুক্তির পর কিছু দাড়ি-টুপি পরা লোক যুবককে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করলে; সেই ছবি ধ্রুপদি ছবি হয়ে ঘুরতে থাকে। অন্যদিকে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি না হওয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতার হাতে নিহত ভ্যানচালক, কিংবা লঞ্চে যুবদলের নেতা এক জুলাই আন্দোলনের তরুণীকে ধর্ষণ করলে; তা নিয়ে অনুশীলিত নির্লিপ্ততা নেমে আসে। ফলে আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপির পক্ষে সিলেকটিভ অ্যাকটিভিজমে নেমে পড়ে কথিত কালচারাল উইং।
যে কলকাতায় বেঙ্গল রেনেসাঁ হয়েছিল; সেই কলকাতা আজ বিশ্বায়নের ঢেউয়ে প্রগতিশীলতার বিশ্ববীক্ষা অর্জন করেছে। ফলে বঙ্কিমচন্দ্রের উন্নাসিকতা আজকের কলকাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু নব্বইয়ের ঢাকা রেনেসাঁ আজও বঙ্কিম যুগে পড়ে আছে। বঙ্কিমের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে যেমন একদল মানুষকে নিম্নবর্গের তকমা দিতে হয়; ঢাকা রেনেসাঁর বঙ্কিমদের তেমনি আত্মবিশ্বাস বাড়াতে একদল মানুষকে নিম্নবর্গের তকমা দিতে হয়। বেঙ্গল রেনেসাঁর বঙ্কিম ও ঢাকা রেনেসাঁর বঙ্কিম, দুজনের চোখেই মুসলমান সেই নিম্নবর্গ; যাকে অনার্য ডাকলে নিজের আর্য কল্পনায় দোলা লাগে। মুখমণ্ডলে; দেহ সৌষ্ঠবে আর্য চিহ্ন নাইবা থাকুক; আরেকজনকে অনার্য তকমা দিলেই আর্য কল্পনায় হৃদয় নেচে ওঠে।
ঠিক এ কারণেই কলকাতা আজ হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে; আর ঢাকার কালচারাল উইং হিন্দুত্ববাদের সাধনা করে। ফলে ইউনূসের বিরুদ্ধে ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রচারে সে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেয়, সীমান্ত হত্যায় টু শব্দ করে না, আদানির সঙ্গে অসম চুক্তির ব্যাপারে সে স্পিকটি নট। কিন্তু মার্কিন চুক্তি নিয়ে সে আলুথালু।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করতে দরকার হলে সে ফিলিস্তিন নিয়ে কাঁদবে; কিন্তু বাংলাদেশে ‘প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ তৈরির মোদি প্রকল্পে সে নান্দনিক শ্রমিক হবে। প্রতিবেশী ভারত থেকে শুরু করে ইউরোপের যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে চায়; তারা প্রত্যেকে অসম চুক্তিতেই স্বাক্ষর করে। ভারতকেও রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কিনতে ওয়াশিংটনের অনুমতি নিতে হয়। ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বিনিয়োগ ও ট্রেজারি বন্ড কিনতে বাধ্য হতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু সুপার পাওয়ার; বিশ্ববাস্তবতায় সে আজও মাতবরি করে চলেছে; এই মাতবরি তিলে তিলে কমাতে চীনের যে অর্থনৈতিক প্রস্তুতি, সেই সামর্থ্য অর্জন অন্য কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি।
জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কারা যাবে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ঋণ কে পাবেÑএসব নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের মাতবরি তো রয়েছেই। সেই বাস্তবতায় ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম চুক্তিতে রাজি হয়েছেন। বাংলাদেশ কখনো চীনের মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্জন করলে সেসব চুক্তির শেকল থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে যারা ইউনূস কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম চুক্তিতে রাজি হলেন এ নিয়ে ব্যস্ত; তাদের একটি অংশ আত্মনির্ভর উন্নয়ন কৌশল ও আত্মসম্মান বোধের পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু আরেকটি অংশ ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তিগুলো নিয়ে যাতে আলোচনা না হতে পারে; সে জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে টেবিল গরম করে রাখেন।
ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তী প্রশাসন চালাতে গিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হারানো জমিদারি ফিরে পেতে উদ্যত ভারতীয় আগ্রাসন আর জেনেটিক্যালি জমিদারের দাসত্ব করা কোটাল পুত্রদের কালচারাল অ্যাকটিভিজমের পাহাড় প্রমাণ বাধা ঠেলতে হয়েছে। পুরোনো বন্দোবস্তে অবরুদ্ধ বাংলাদেশকে মুক্ত করার যে জেনজি লড়াই; জেন আলফাদের মধ্যে বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পাওয়ার যে আকুতি; ইউনূস সেই আকাঙ্ক্ষার সারথি হতে চেয়েছেন। কারণ তিনি দেখেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গ্রাউন্ড জিরোতে মিশে যাওয়া ইউরোপের দেশগুলো কীভাবে দশ থেকে পনেরো বছরে রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে কল্যাণরাষ্ট্রের পথে হেঁটেছে।
কিন্তু প্রায় একই সময়ে স্বাধীন হওয়া ভারত ও পাকিস্তান আর ৫৫ বছর আগে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ কতগুলো জমিদার পরিবার, তাদের কালচারাল কোটাল পুত্র, বিদ্বেষ ও বিভাজনের থকথকে কাদা, বৈষম্য ধূসর নরভোজ; দেশপ্রেম ও ধর্মপ্রেমের ছেনালি, কালো টাকা ও পেশি শক্তির ভীতি, গোয়েন্দা সংস্থা আর সিভিল-মিলিটারি বুরোক্র্যাসির ছায়ানৃত্য, রাষ্ট্রক্ষমতা মানে দেশ লুণ্ঠনের লাইসেন্স, মানুষ হত্যার মাংসের কারবার, অলিগার্কের আস্ফালন আর রেললাইনের ধারের প্রাতঃক্রিয়ার জেনেটিক বৈশিষ্ট্যকে মিডিয়ায় উপস্থাপনের অকল্যাণরাষ্ট্র হয়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দেশ লুণ্ঠনের অপশাসনের সঙ্গে ইউনূস শাসনের ইকুয়ালাইজ করতে যে লোকগুলো প্রতিনিয়ত সক্রিয়; নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের লোক দাবি করে, যারা ভারতের কাছে সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করে, জুলাই বিপ্লবীদের জুলাই জঙ্গি বলে যারা পেলব প্রগতিশীলতার উপটান মুখে মাখতে চেষ্টা করে; এরা সেই পলাশীর যুদ্ধের মীরজাফর ও জগৎশেঠদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। অথবা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারের শরীরে তেল মালিশ করার সময় যে ডিএনএ, দ্রোহী কৃষককে কলঙ্ক দেওয়ার কিংবা গলা কেটে দেওয়ার শলা আঁটত; তারাই ফিরে ফিরে আসে টকশোতে-উপসম্পাদকীয়তে, ফেসবুকে অথবা রাজ দরবারের চিংড়ি-লাউ কিংবা শজনে চচ্চড়ির শাকান্ন সভায়।
হয়তো চাকরস্য চাকর স্বভাবের বুমারস, জেনেক্স ও মিলেনিয়াল কতিপয়; জেনজি ও জেন আলফার মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে গলাটিপে ধরতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কোটাল পুত্রের জাতিস্মর হয়ে আরো কিছুকাল আমাদের সমাজকে পেছন থেকে টেনে ধরবে। কিন্তু সার্বভৌমত্বপ্রিয় ও সাম্যের আকাঙ্ক্ষায় সংগ্রামশীল জুলাই প্রজন্মকে পরাজিত করা কঠিন হবে। জাড্য জরদগব অচলায়তন ধসে পড়বে নবীনের জুলাই বিপ্লবের অভিঘাত থেকেই। ড. ইউনূস যে রিসেট বাটনের কথা বলেছিলেন, তা আসলে দাসত্বের মনোজগৎ পেরিয়ে মুক্তিযাত্রার মনস্তত্ত্ব। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার; মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোকানদাররা ৫৫ বছর ধরে এই প্রতিটি অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। জুলাই বিপ্লবীরাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার রক্ষার মিছিল শুরু করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার লিপ সার্ভিস দিয়ে আওয়ামী লীগ এই মুক্তির মিছিলের ১৪০০ শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণীকে হত্যা করেছে; পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে আরো কয়েক হাজার তরুণকে। হাসিনার খুনে পুলিশের ভাষায়, গুলি খেয়ে একজন পড়ে গেলে বাকি ৯ জন দাঁড়িয়ে থাকে। মৃত্যুভয়কে জয় করেছে যে জুলাই প্রজন্ম; তাদের আটকে রাখা কার সাধ্য।
ড. ইউনূস বলেছিলেন, দেশ আর কখনোই ৫ আগস্টের আগে ফিরে যাবে না। এই অমোঘ বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যারা পুনরাবৃত্তিকর মানবতাবিরোধী আয়ুধ নিয়ে ৫ আগস্টের আগে ফিরে যেতে চায়; তারা অবিমৃশ্যকারী; বাংলাদেশের আগামী যাত্রায় মিসফিট।













