গণমাধ্যম কর্পোরেট হাউজ সম্পর্কে ধারণা
গণমাধ্যম কর্পোরেট হাউজ কোনো নতুন ঘটনা নয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে গণমাধ্যমের আবির্ভাবের সময় থেকেই এদের অস্তিত্ব ছিল। তবে বিশ্বায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং গণমাধ্যমের বাণিজ্যিকীকরণের সমসাময়িক যুগে এরা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যম কর্পোরেট হাউজগুলো অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা দ্বারা পরিচালিত হয়। তারা দর্শক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের আকৃষ্ট করে মুনাফা সর্বোচ্চ করতে চায়, পাশাপাশি জনমত ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে নিজেদের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধকে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট থাকে। গণমাধ্যম কর্পোরেট হাউজ হলো বড় বড় কনগ্লোমারেট, যারা সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মতো বিভিন্ন মাধ্যম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে। সময়ের পরিক্রমায় ছোট ছোট স্বাধীন সত্তা থেকে এগুলো বিশাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং সমাজে তথ্যের উৎপাদন, বিতরণ ও ভোগের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিষয়ে, উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।ভেগানিজম বা নিরামিষাশী জীবনদর্শন কী? এটি কি একটি ভুল ধারণা?
গণমাধ্যম কর্পোরেট হাউজগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: অনুভূমিক (horizontal) এবং উল্লম্ব (vertical)। অনুভূমিক গণমাধ্যম হাউজগুলো মুদ্রণ, সম্প্রচার ও অনলাইনের মতো বিভিন্ন খাত বা ঘরানার গণমাধ্যম মালিকানাধীন রাখে। উদাহরণস্বরূপ, ডিজনির অধীনে এবিসি (ABC), ইএসপিএন (ESPN), মার্ভেল, পিক্সার এবং স্টার ওয়ার্স রয়েছে। অন্যদিকে উল্লম্ব গণমাধ্যম হাউজগুলো একই খাতের বিভিন্ন পর্যায় বা বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণস্বরূপ, কমকাস্ট (Comcast) এনবিসিইউনিভার্সাল-এর মালিক, যা টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং স্ট্রিমিং পরিষেবার জন্য বিষয়বস্তু উৎপাদন ও বিতরণ করে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম সংস্থাগুলোর ওপর দৃষ্টিপাত করলে তাদের প্রভাবের গভীরতা স্পষ্ট হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭৬ সালে স্টিভ জবস ও স্টিভ ওজনিয়াক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অ্যাপল একটি প্রযুক্তি কোম্পানি থেকে প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের সংকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। ২.৭৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার মূলধন নিয়ে অ্যাপল এখন অ্যাপল মিউজিক, অ্যাপল টিভি, অ্যাপল বুকস এবং অ্যাপল নিউজের মতো স্ট্রিমিং ও সংবাদ পরিষেবায় যুক্ত হয়েছে। বিটস (Beats) ও শ্যাজাম (Shazam) অধিগ্রহণ তাদের গণমাধ্যম জগতে বিস্তৃতিরই প্রমাণ। গণমাধ্যমের আরেক প্রভাবশালী নাম ওয়ার্নার ব্রস. ডিসকভারি, যা ২০২২ সালের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশাল পোর্টফোলিওসহ এই কোম্পানিটি ওয়ার্নার ব্রস. ফিল্ম ও টেলিভিশন স্টুডিও, ডিসি এন্টারটেইনমেন্ট, এইচবিও, টার্নার ব্রডকাস্টিং, টিএনটি এবং সিএনএন-এর মতো মাধ্যমগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের প্রভাব বিভিন্ন গণমাধ্যম খাতে ছড়িয়ে রয়েছে, যা তাদের এই শিল্পে এক শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত করেছে। বৃহৎ গণমাধ্যম কোম্পানিগুলো পরিচিত হলেও, করপোরেট প্রভাব কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক কনগ্লোমারেট তথ্যের ওপর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। উদাহরণস্বরূপ, বিবিসি, এইচবিও, সিএনএন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এবং এমটিভি বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত, যা তাদের ব্যাপক বিস্তৃতি ও প্রভাবের প্রমাণ দেয়। এই দানবীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় গণমাধ্যম হাউজগুলোর সাথে কর্পোরেট সংযোগ ও সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের মালিকানার ধরণকে প্রভাবিত করে। তথ্য প্রচার ও গ্রহণের ওপর এই নিয়ন্ত্রণ বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।রাজনৈতিক বয়ানে গণমাধ্যমের প্রভাব
গণমাধ্যম কর্পোরেট হাউজগুলো রাজনৈতিক সংবাদকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলার ক্ষমতা রাখে। তারা কোনো সংবাদের কিছু দিককে গুরুত্ব দিয়ে অন্যগুলোকে গৌণ করে ফেলে, যার ফলে জনমত ও নীতি-নির্ধারণী বিতর্ক প্রভাবিত হয়। বয়ান নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক ঘটনা এবং বিষয়গুলো সম্পর্কে জনসাধারণের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করার সামর্থ্য রাখে।রাজনৈতিক সংবাদের কাঠামো নির্ধারণ
গণমাধ্যম কর্পোরেট হাউজগুলো রাজনৈতিক বয়ান প্রভাবিত করার প্রাথমিক কৌশল হিসেবে 'ফ্রেমিং' বা কাঠামো নির্ধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করে। তারা সংবাদ পরিবেশনের সময় নির্দিষ্ট তথ্য নির্বাচন করে এবং নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে তা উপস্থাপন করে, যা দর্শকদের রাজনৈতিক উন্নয়ন উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি গণমাধ্যম কোনো নীতির অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর জোর দিয়ে এর সামাজিক ফলাফলগুলোকে উপেক্ষা করতে পারে, যা জনমনে ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধির জন্ম দেয়।আফ্রিকায় ফরাসি ঔপনিবেশিকতা: এক জটিল উত্তরাধিকারের উন্মোচন
মক্কা চুক্তি ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয়েছে, এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ ধরা হবে। বাংলাদেশের যুক্তি সহজ: সীমান্ত হত্যা, পানি আর ট্রানজিট — তিনটিতেই দরকষাকষির জায়গা এখন প্রায় শূন্য। এই লেখার দাবি, একটি যৌথ কাঠামো সেই জায়গাটা ফিরিয়ে দিতে পারে।
এজেন্ডা সেটিং এবং জনমত
এজেন্ডা সেটিং বা আলোচ্যসূচি নির্ধারণের মাধ্যমে গণমাধ্যমের প্রভাব জনমতের ওপর এক শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে। কোন সংবাদের গুরুত্ব কতটুকু হবে এবং তা কীভাবে উপস্থাপিত হবে—এই ক্ষমতা গণমাধ্যম হাউজগুলোর হাতেই থাকে। এর মাধ্যমেই ঠিক হয় জনসাধারণের কাছে কোন ইস্যুগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই প্রভাব বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়সের সীমা, শিক্ষা, বসবাসস্থল, রাজনৈতিক আদর্শ এবং জাতীয় ম্যাক্রো ভেরিয়েবল যেমন—অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে এজেন্ডা সেটিংয়ের প্রভাব ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, যে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বেশি, সেখানে এজেন্ডা সেটিংয়ের প্রভাব সাধারণ নাগরিকদের ওপর বেশি কার্যকর হতে পারে। ডিজিটাল যুগে এই এজেন্ডা সেটিংয়ের ক্ষমতা আরও প্রকট। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। তথ্যের উৎস হিসেবে মানুষ এখন নিজের পছন্দের কনটেন্টের ওপর বেশি নির্ভরশীল, যার ফলে একটি বড় অংশ মূলধারার সংবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর ফলে 'ডেমোক্রাটেইনমেন্ট' এবং 'পলিটিকোটেইনমেন্ট'-এর মতো বিনোদনমূলক রাজনৈতিক ধারার উদ্ভব হয়েছে। এজেন্ডা সেটিংয়ের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো দুর্নীতির উপলব্ধির ওপর এর প্রভাব। গবেষণায় দেখা গেছে, সংবাদের উৎস (সোশ্যাল মিডিয়া বনাম প্রথাগত মিডিয়া) রাজনৈতিক দুর্নীতির সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করে। যারা মূলত সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংবাদ গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে দুর্নীতির ধারণা প্রথাগত সংবাদ গ্রহণকারীদের তুলনায় বেশি হতে পারে। এছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে দুর্নীতি সম্পর্কে ধারণা অধিক মেরুকৃত হতে পারে।ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের ওপর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রভাব
২০১৯ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের সংবাদ কভারেজে বিবিসি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের সম্মুখীন হয়। সমালোচকদের মতে, বিবিসি ব্রেক্সিটপন্থীদের বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল এবং ব্রেক্সিট বিরোধীদের মতামতকে উপেক্ষা করেছিল। বিবিসি এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিকে জোরালো করে। সামগ্রিকভাবে, গণমাধ্যম হাউজগুলোর এজেন্ডা সেটিং ক্ষমতা রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে এবং জনসমক্ষে ইস্যুর গুরুত্ব নির্ধারণ করে। এটি রাজনৈতিক দৃশ্যপট গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা
সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান গণমাধ্যম হাউজগুলোর প্রভাব ও পৌঁছানোর ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হয়ে উঠেছে, যা ব্যক্তিগত ও দলীয় মিথস্ক্রিয়াকে সহজতর করেছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সরকারগুলোর জন্য নাগরিকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিম্নলিখিত দিকগুলোতে পরিলক্ষিত হয়: ১. **রাজনৈতিক সচেতনতা ও তথ্য:** সোশ্যাল মিডিয়া বিশ্বজুড়ে সংবাদ ও তথ্য বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। নাগরিকরা এখন রাজনৈতিক বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পেতে এর ওপর নির্ভরশীল। ২. **রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা:** সোশ্যাল মিডিয়ার নেটওয়ার্ক প্রকৃতি মানুষকে মত প্রকাশ ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে। এটি অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। ৩. **রাজনৈতিক মেরুকরণ:** সোশ্যাল মিডিয়া রাজনৈতিক বয়ানকে প্রভাবিত করে আদর্শিক ও আবেগীয় উভয় প্রকার মেরুকরণ বাড়াচ্ছে। গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সমাজে রাজনৈতিক বিভাজন প্রকট হচ্ছে। ৪. **ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি:** সেন্সরশিপ কমিয়ে তথ্য প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। যদিও এটি বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, তবে এটি উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং বিভিন্ন ঝুঁকির কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে।গণমাধ্যমের পক্ষপাত ও এর ফলাফল
গণমাধ্যমের পক্ষপাত আজকের বিশ্বে একটি উদ্বেগজনক বিষয়। এর ফলে সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পায়। পক্ষপাত বলতে বোঝায় সাংবাদিক ও সংবাদ নির্মাতারা কোনো ঘটনার নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করেন। এই পক্ষপাত সারা বিশ্বে একটি বিতর্কিত বিষয়। পক্ষপাতিত্বের তিনটি বড় ধরণ হলো—দলীয় পক্ষপাত, সেনসেশনালিজম বা চাঞ্চল্য সৃষ্টি এবং বাছাইকৃত সংবাদ প্রচার।দলীয় পক্ষপাত
যখন কোনো গণমাধ্যম নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ বা ব্যক্তির প্রতি নমনীয়তা দেখায়, তখন তাকে দলীয় পক্ষপাত বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজ বা সিএনএন-এর সংবাদ কভারেজ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গবেষণায় দেখা গেছে, দলীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো জনমতের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। যারা ফক্স নিউজ এবং সিএনএন—উভয়কেই নিয়মিত দেখেছে, তাদের মধ্যে কোভিড-১৯ মহামারি এবং বর্ণবাদী আন্দোলনের মতো বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে দেখা গেছে।ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার পেগাসাস: আপনার যা জানা প্রয়োজন
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
সেনসেশনালিজম (চাঞ্চল্য সৃষ্টি)
সেনসেশনালিজম বা চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী সংবাদ পরিবেশন হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে পাঠক বা দর্শকদের শক্তিশালী আবেগীয় প্রতিক্রিয়া আদায়ের জন্য সংবাদকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম আকর্ষণীয় সংবাদগুলোকে আড়ালে ফেলে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও বিপর্যয়ের মতো সংবাদের অতিরঞ্জিত উপস্থাপনা বিশ্বব্যাপী একটি সাধারণ বিষয়। এটি সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং অযৌক্তিক আচরণে প্ররোচিত করতে পারে।চীনের উইঘুর সংখ্যালঘু কারা? তাদের সাথে কী ঘটছে?
ড. ইউনূস ও তার কিছু উপদেষ্টার সার্বভৌম চিন্তাকে বাংলাদেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠিত আলোকিত সমাজ, ব্যবসায়ী, সিভিল-মিলিটারি বুরোক্র্যাসির সিনিয়র পর্যায়ের লোকরা ও ডিপস্টেট ভারত প্রভুর প্রতি বেয়াদবি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেটি বুঝেই ইউনূস প্রশাসনের যারা নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারে পদপদবি চান, তারা সমঝে চলেছেন। ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত, তারা ঢাকার ভারত ভক্ত কালচারাল সাব-সোসাইটিতে ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন।
বাছাইকৃত সংবাদ প্রচার
বাছাইকৃত সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনো ঘটনা বা তথ্য ইচ্ছেকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। একে ‘উপেক্ষা করার মাধ্যমে পক্ষপাত’ (bias by omission) বলা হয়। এটি অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশনের পথ প্রশস্ত করে।কিউবার প্রতি আমেরিকার নির্মম আচরণ: কূটনৈতিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ
গণমাধ্যমগুলো এছাড়া আরও কিছু কৌশলের আশ্রয় নেয়, যেমন: **চেরি-পিকিং:** নিজের পছন্দের বয়ান সমর্থন করে এমন উপাত্ত ব্যবহার করা এবং বিপরীতে থাকা তথ্যসমূহ এড়িয়ে যাওয়া। **লোডেড ল্যাঙ্গুয়েজ:** ইতিবাচক বা নেতিবাচক ভাব বহন করে এমন শব্দ ব্যবহার করে সংবাদের অর্থ পরিবর্তন করা (যেমন—কাউকে 'র্যাডিক্যাল' বা 'উগ্রপন্থী' আখ্যা দেওয়া)। **অপিনিয়ন পিস বা সম্পাদকীয়:** ব্যক্তিগত মতামতকে নিরপেক্ষ সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করে নির্দিষ্ট আদর্শ বা এজেন্ডা প্রচার করা।জনমতের ওপর প্রভাব
মিডিয়া পক্ষপাত জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। ভারতের নোটবাতিল (Demonetization) প্রক্রিয়ার সময় টুইটারে সংবাদের বেশিরভাগই ছিল ব্যক্তিনিষ্ঠ, যা দর্শকদের মতামতকে একপেশে করে তুলেছিল। এছাড়া গণমাধ্যম বিদেশ সম্পর্কেও জনমত প্রভাবিত করে। যেমন, মার্কিন নাগরিকরা চীন সম্পর্কে তাদের বেশিরভাগ ধারণাই গড়ে তোলে গণমাধ্যম থেকে, ফলে পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন তাদের চীন-নীতিকে প্রভাবিত করে।গণমাধ্যমের মালিকানা ও রাজনৈতিক বয়ান
মালিকানার কেন্দ্রীকরণ গণমাধ্যমের বহুত্ববাদ ও মতামতের বৈচিত্র্যকে সংকুচিত করে ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ছয়টি গণমাধ্যম কনগ্লোমারেট অধিকাংশ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে জনসমক্ষে খুব সীমিত দৃষ্টিভঙ্গিই উপস্থাপিত হয়। এই কেন্দ্রীকরণ মুনাফামুখী সংবাদ পরিবেশনকে উৎসাহিত করে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। মালিকানার কেন্দ্রীকরণ গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ।জেন্ডার পে গ্যাপ বা লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য কী? এটি কি সত্যিই বিদ্যমান?
গণমাধ্যম কর্পোরেট হাউজ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন
বিবিসি, ফক্স নিউজ, সিএনএন-এর মতো দানবীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের মালিকানার ধরণকে নিয়ন্ত্রণ করছে। অ্যান্ড্রু টেটের ঘটনাটি গণমাধ্যমের বয়ান তৈরির এক বিপজ্জনক উদাহরণ। ২০২০ সালে বিবিসি এবং অন্যান্য গণমাধ্যম কোনো পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই টেটের বিরুদ্ধে মিসোজিনি বা নারীবিদ্বেষের অভিযোগ আনে, যা তাকে অনলাইনে হেনস্তার শিকার করে। পরবর্তীতে টেট বিবিসির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। এই ঘটনাটি একটি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে—গণমাধ্যম কি তাদের সাথে ভিন্নমত পোষণকারীদের কণ্ঠরোধ করার জন্য এসব করছে? কিছু মানুষের মতে, বিবিসি এবং সংশ্লিষ্টরা সমাজে এক "ওক" (woke) বয়ান জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে। অ্যান্ড্রু টেটের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই গণমাধ্যম কীভাবে কারো খ্যাতি ও অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে।'ওক কালচার' বা সচেতনতা সংস্কৃতি কী? কেন এটি এত বিতর্কিত?
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে "ক্যানসেল কালচার" বা কাউকে সামাজিকভাবে বর্জন করার প্রবণতা মুক্তচিন্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এই প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে, যা গ্রুপথিংক বা গড্ডালিকা প্রবাহকে উৎসাহিত করে। মুক্ত বিতর্ক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের এই গণমাধ্যমগুলোর কৌশল সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।



