Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন
মানবিক সংকটমধ্যপ্রাচ্য / আরব উপদ্বীপবহুমুখী গৃহযুদ্ধ, লোহিত সাগর সংঘাত ও দুর্ভিক্ষ

ইয়েমেন সংকট: লোহিত সাগরের রণক্ষেত্র, ভূ-রাজনীতি ও শতাব্দীর ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়

দশকের প্রক্সি যুদ্ধ, আনসারুল্লাহর উত্থান, বাব এল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের আর্তনাদ

মেরুনপেপার ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা ডেস্ক•হালনাগাদ: ২০২৬ পর্যালোচনা
শেয়ার করুন:
সারসংক্ষেপ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

ইয়েমেন সংকটকে জাতিসংঘ আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবসৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ব্যর্থ হলে দেশটিতে সংঘাত তীব্র রূপ নেয়। ২০১৪ সালে শিয়া জাইদি গোষ্ঠী আনসারুল্লাহ (যাদের হুথি নামে ডাকা হয়) রাজধানী সানা দখল করে। ২০১৫ সালে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোট হুথিদের হটাতে সর্বাত্মক বিমান হামলা ও নৌ-অবরোধ শুরু করে। এক দশকের এই প্রক্সি যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং অপুষ্টি, কলেরা ও চিকিৎসা সংকটে দেশটির ৮০ শতাংশেরও বেশি নাগরিক আন্তর্জাতিক ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে গাজায় সংহতি জানিয়ে লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হুথিদের হামলা এই সংঘাতকে বৈশ্বিক ভূ-অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

# মূল পরিসংখ্যান ও ফ্যাক্টস

সংঘাতের সময়কাল
১১+ বছর
২০১৪ সালে রাজধানী সানা পতনের পর থেকে চলমান যুদ্ধ
মানবিক সহায়তাপ্রার্থী
২.১৬ কোটি
মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০% মানুষ খাদ্য ও চিকিৎসার জন্য ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল
অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত
৪৫+ লাখ
গৃহযুদ্ধ ও অবিরাম বোমাবর্ষণে গৃহহীন নাগরিক
কৌশলগত প্রণালী
বাব এল-মান্দেব
বিশ্বের ১২% আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার
ঐতিহাসিক শিকড়

উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন

ঐতিহাসিকভাবে ইয়েমেন উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। ১৯৯০ সালে দুই অংশ একত্রিত হয়ে বর্তমান ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠন করে এবং আলি আব্দুল্লাহ সালেহ দীর্ঘ ৩৩ বছর দেশটির রাষ্ট্রপতি থাকেন। সালেহর আমলে রাজনৈতিক দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং উত্তরের জাইদি শিয়াদের প্রান্তিকীকরণের ফলে হুসাইন বাদরুদ্দীন আল-হুথির নেতৃত্বে ১৯৯০-এর দশকে 'বিশ্বাসীদের যুবক' আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা পরে আনসারুল্লাহ নামে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। ২০১১ সালের গণআন্দোলনে সালেহর পতনের পর উপ-রাষ্ট্রপতি মনসুর হাদি ক্ষমতায় আসেন, কিন্তু তিনি অর্থনৈতিক সংকট ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মোকাবিলায় ব্যর্থ হন। ২০১৪ সালে হুথিরা সালেহপন্থীদের সমর্থনে সানা দখল করলে হাদি রিয়াদে পালিয়ে যান এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে।

ঐতিহাসিক কালরেখা ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ

২০১১

আরব বসন্ত ও সালেহ বিরোধী আন্দোলন

স্বৈরশাসক আলি আব্দুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে লাখো মানুষের রাজপথে অবস্থান; উপসাগরীয় মধ্যস্থতায় ক্ষমতা হস্তান্তর।

২০১৪

হুথিদের সানা দখল

উত্তর ইয়েমেন থেকে নেমে এসে হুথি যোদ্ধাদের রাজধানী সানার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ; প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদির ক্ষমতাচ্যুতি।

২০১৫

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হস্তক্ষেপ

অপারেশন ডিসাইসিভ স্টর্ম শুরু; বিমান হামলা ও সর্বাত্মক সামুদ্রিক অবরোধের ফলে তীব্র মানবিক সংকটের সূচনা।

২০১৮

স্টকহোম চুক্তি

লোহিত সাগরের প্রধান বন্দর হোদাইদাহ ঘিরে যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক প্রয়াস; মানবিক ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি।

২০২৩-২০২৪

লোহিত সাগরে হুথিদের নৌ-অভিযান

গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে বাব এল-মান্দেব প্রণালীতে পশ্চিমা ও ইসরায়েলি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।

২০২৫-২০২৬

মার্কিন ও ব্রিটিশ বিমান হামলা এবং অচলাবস্থা

হুথি লক্ষ্যবস্তুতে পশ্চিমাদের শত শত বিমান হামলা সত্ত্বেও সামরিক প্রতিরোধ অব্যাহত; শান্তি আলোচনায় নতুন সমীকরণ।

ক্ষমতার মানচিত্র

মূল পক্ষ ও অংশীদারদের ভূমিকা

আনসারুল্লাহ (হুথি আন্দোলন)

কার্যত কর্তৃপক্ষ
উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল এবং রাজধানীর নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি

অবস্থান ও কৌশল: ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব দাবি, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি

নেতৃত্ব/প্রতিনিধি: আব্দুল মালিক আল-হুথি

প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (PLC / আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকার)

স্বীকৃত সরকার
দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর এডেনভিত্তিক সমান্তরাল সরকার

অবস্থান ও কৌশল: হুথিদের হটিয়ে সমগ্র ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা

নেতৃত্ব/প্রতিনিধি: রাশাদ আল-আলিমি

সৌদি আরব ও আরব সামরিক জোট

আঞ্চলিক পরাশক্তি
আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারের প্রধান সামরিক ও আর্থিক সমর্থক

অবস্থান ও কৌশল: দক্ষিণ সীমান্তে ইরানি প্রভাবের বিস্তার ঠেকানো ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষা

সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (STC)

বিচ্ছিন্নতাবাদী মিত্র
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) সমর্থিত দক্ষিণের শক্তিশালী দল

অবস্থান ও কৌশল: স্বাধীন দক্ষিণ ইয়েমেন রাষ্ট্র পুনরুদ্ধার

নেতৃত্ব/প্রতিনিধি: আইদারুস আল-জুবাইদি

ইরান ও প্রতিরোধ অক্ষ

আঞ্চলিক মিত্র
হুথিদের প্রধান রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত পৃষ্ঠপোষক

অবস্থান ও কৌশল: উপসাগরে মার্কিন ও সৌদি একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা

আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো

মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌ চলাচলের স্বাধীনতা (UNCLOS)

জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক প্রণালীতে সকল দেশের অহিংস নৌ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।

রেফারেন্স: UN Convention on the Law of the Sea (1982)

অবরোধ ও দুর্ভিক্ষকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার নিষিদ্ধ

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও রোম সংবিধি অনুযায়ী বেসামরিক জনগণের খাদ্য ও ওষুধের পথ বন্ধ করে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা যুদ্ধাপরাধ।

রেফারেন্স: Rome Statute, Article 8(2)(b)(xxv)
বৈশ্বিক সমীকরণ

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও পরাশক্তিদের ভূমিকা

বাব এল-মান্দেব প্রণালী ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য

এই সরু প্রণালীটি লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এই রুটে হুমকি তৈরি হলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হয়, যা বৈশ্বিক শিপিং খরচ ও মুদ্রাস্ফীতিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সৌদি-ইরান সমঝোতার প্রভাব

২০২৩ সালে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ইয়েমেনে সরাসরি সৌদি বিমান হামলা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধান

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

হুথি কারা এবং তারা কেন লড়াই করছে?+

হুথিরা মূলত ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের জাইদি শিয়া মতাবলম্বীদের একটি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলন, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আনসারুল্লাহ’ নামে পরিচিত। তারা ১৯৯০-এর দশকে তৎকালীন সরকারের বৈষম্য এবং পশ্চিমা ও ওয়াহাবি ধর্মীয় প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে তারা ইয়েমেনের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক কর্তৃত্ব।

ইয়েমেন যুদ্ধকে কেন 'ভুলে যাওয়া যুদ্ধ' বলা হতো?+

পশ্চিমা মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি দীর্ঘদিন ইউক্রেন বা অন্যান্য সংকটে বেশি মনোযোগ দিলেও ইয়েমেনের ব্যাপক প্রাণহানি, অনাহার এবং কলেরা মহামারী বহুলাংশে উপেক্ষিত ছিল। তবে লোহিত সাগরে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে বাধার পর এটি আবারও বৈশ্বিক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

কেন হুথিরা লোহিত সাগরে জাহাজে আক্রমণ করছে?+

হুথিদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসন ও সম্পূর্ণ খাদ্য-ওষুধ অবরোধের জবাবে তারা ইসরায়েলগামী ও ইসরায়েল-মালিকানাধীন জাহাজে আক্রমণ শুরু করেছে। গাজায় খাদ্য ও ত্রাণ প্রবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

তথ্যসূত্র ও আন্তর্জাতিক দলিল

মুক্ত মতামতের আহ্বান

ইয়েমেন সংকটে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করুন

আপনি কি ইয়েমেন পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক আইন বা ভূ-রাজনীতি নিয়ে বিশদ গবেষণা বা মতামত লিখতে চান? মেরুনপেপারের প্ল্যাটফর্মে আপনার বিশ্লেষণ তুলে ধরুন।

লেখা পাঠান

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।