পশ্চিম সাহারা সংকট: আফ্রিকার শেষ উপনিবেশ, বালির প্রাচীর ও সাহরাউই আত্মনিয়ন্ত্রণ
১৯৭৫-এ স্প্যানিশ বিদায়ের পর মরক্কোর সামরিক দখল, পলিসারিও ফ্রন্ট ও তিন দশক ধরে থমকে থাকা জাতিসংঘের গণভোট
পশ্চিম সাহারা হলো আফ্রিকান মহাদেশের একমাত্র অবশিষ্ট ভূখণ্ড যা জাতিসংঘ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অ-স্বশাসিত ভূখণ্ড’ (Non-Self-Governing Territory) বা উপনিবেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত এই ভূখণ্ডটি ছিল স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ। ১৯৭৫ সালে স্পেন তড়িঘড়ি করে বিদায় নেওয়ার পর মরক্কো প্রায় সাড়ে তিন লাখ নাগরিকের 'সবুজ পদযাত্রা' (Green March) এবং সামরিক অভিযানের মাধ্যমে অঞ্চলটির প্রায় ৮০% এলাকা দখল করে নেয়। স্থানীয় আদিবাসী সাহরাউই জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন 'পলিসারিও ফ্রন্ট'-এর নেতৃত্বে স্বাধীন 'সাহরাউই আরব গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' (SADR) ঘোষণা করে অস্ত্র তুলে নেয়। ১৯৯১ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি গণভোটের শর্তে যুদ্ধবিরতি হয়, যাতে সাহরাউইরা নির্ধারণ করবে তারা স্বাধীনতা নাকি মরক্কোর সাথে অন্তর্ভুক্তি চায়। তবে তিন দশকেরও বেশি সময় পার হলেও মরক্কোর বাধার কারণে সেই গণভোট কখনোই অনুষ্ঠিত হয়নি।
# মূল পরিসংখ্যান ও ফ্যাক্টস
উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন
সাহরাউইরা সাহারা মরুভূমির যাযাবর বেদুইন সংস্কৃতি ও হাসসানিয়া আরবি ভাষার ধারক। ১৮৮৪ সালের বার্লিন সম্মেলনে ইউরোপীয়রা আফ্রিকা ভাগ করার সময় পশ্চিম সাহারা স্পেনের অধীনে ন্যস্ত হয়। এক শতাব্দী ধরে স্প্যানিশ শাসনের পর ১৯৭৩ সালে যুবনেতা এল-ওয়ালি মুস্তফা সায়েদের নেতৃত্বে পলিসারিও ফ্রন্ট (Polisario Front) গঠিত হয়। ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এক ঐতিহাসিক পরামর্শমূলক রায়ে ঘোষণা করে যে মরক্কোর সাথে পশ্চিম সাহারার ঐতিহাসিক কিছু আনুগত্যের সম্পর্ক থাকলেও তা ভূখণ্ডের ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্ব প্রমাণ করে না এবং সাহরাউই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু মরক্কোর বাদশাহ দ্বিতীয় হাসান এই রায়কে অগ্রাহ্য করে দখল কায়েম করেন। মরক্কো দখলকৃত এলাকা রক্ষায় বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সামরিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর—২,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বালির দেয়াল (The Berm)—নির্মাণ করেছে এবং লাখ লাখ স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে। এর ফলে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ সাহরাউই মানুষ গত ৫০ বছর ধরে আলজেরিয়ার রুক্ষ তিনদুফ মরুভূমির শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
ঐতিহাসিক কালরেখা ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ
স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসন
বার্লিন সম্মেলনের মাধ্যমে পশ্চিম সাহারাকে স্প্যানিশ সুরক্ষাবলয়ভুক্ত ঘোষণা।
পলিসারিও ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠা
স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সাহরাউইদের সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) রায় ও গ্রিন মার্চ
আইসিজে কর্তৃক আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি; মরক্কোর বাদশাহ হাসান কর্তৃক সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের প্রবেশ করিয়ে দখল কায়েম।
সাহরাউই প্রজাতন্ত্র (SADR) ঘোষণা
পলিসারিও ফ্রন্ট কর্তৃক স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা এবং আলজেরিয়ায় শরণার্থী শিবিরের সূচনা।
জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতি ও মিনুরসো (MINURSO)
গণভোটের অঙ্গীকারে জাতিসংঘের মিশন প্রতিষ্ঠা; তবে ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধে গণভোট অনির্দিষ্টকাল স্থগিত।
যুদ্ধবিরতির অবসান ও আব্রাহাম চুক্তি সমীকরণ
মরক্কো কর্তৃক ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মরক্কোর দাবিকে একতরফা স্বীকৃতি এবং সংঘাতের পুনরুজ্জীবন।
মূল পক্ষ ও অংশীদারদের ভূমিকা
পলিসারিও ফ্রন্ট ও সাহরাউই প্রজাতন্ত্র (SADR)
স্বাধীনতা আন্দোলনঅবস্থান ও কৌশল: জাতিসংঘ নির্দেশিত নিরপেক্ষ গণভোট এবং পূর্ণ স্বাধীনতা
মরক্কো রাজ্য ও রাজতন্ত্র
দখলদার প্রশাসনঅবস্থান ও কৌশল: পশ্চিম সাহারা মরক্কোর অবিচ্ছেদ্য অংশ; স্বাধীনতার বিকল্প হিসেবে সর্বোচ্চ সীমিত স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাব
আলজেরিয়া
আঞ্চলিক মিত্রঅবস্থান ও কৌশল: সাহরাউই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সমর্থন এবং মরক্কোর আধিপত্যের বিরোধিতা
জাতিসংঘ ও মিনুরসো (MINURSO)
শান্তিরক্ষী সংস্থাঅবস্থান ও কৌশল: আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান ও গণভোট সম্পাদন
মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (ICJ) ১৯৭৫ ঐতিহাসিক রায়
আইসিজে রায় দিয়েছে যে মরক্কো বা মৌরিতানিয়া কারও সাথেই পশ্চিম সাহারার এমন কোনো ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব ছিল না যা সাহরাউই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে খর্ব করতে পারে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ রেজুলেশন ১৫১৪ (উপনিবেশমুক্তি ঘোষণা)
সকল ঔপনিবেশিক দেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মৌলিক নীতির অধীনে পশ্চিম সাহারা এখনও জাতিসংঘের ডিকলোনাইজেশন তালিকায় শীর্ষ অগ্রাধিকার।
ইউরোপীয় বিচার আদালত (CJEU) ২০২৪ ঐতিহাসিক রায়
ইউরোপীয় আদালত মরক্কোর সাথে ইউরোপের মৎস্য ও বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে কারণ পশ্চিম সাহারার প্রাকৃতিক সম্পদ সাহরাউই জনগণের সম্মতি ব্যতীত মরক্কোর মাধ্যমে ভোগ করা অবৈধ।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও পরাশক্তিদের ভূমিকা
বিশ্বের বৃহত্তম ফসফেট ভাণ্ডার ও সমৃদ্ধ উপকূল
পশ্চিম সাহারার বুকরা (Bou Craa) খনিতে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ফসফেট মজুত রয়েছে, যা বৈশ্বিক রাসায়নিক সারের জন্য অপরিহার্য। এছাড়া এর আটলান্টিক উপকূল বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সামুদ্রিক মৎস্য ক্ষেত্রগুলোর একটি।
আলজেরিয়া-মরক্কো তীব্র দ্বৈরথ
পশ্চিম সাহারা সংকট মাগরেব অঞ্চলের দুই বৃহত্তম দেশ আলজেরিয়া ও মরক্কোর মধ্যে স্থায়ী অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও সীমান্ত বন্ধ থাকার প্রধান চালিকাশক্তি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
পশ্চিম সাহারাকে কেন 'আফ্রিকার শেষ উপনিবেশ' বলা হয়?+
আফ্রিকার সমস্ত দেশ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করলেও পশ্চিম সাহারা ১৯৭৫ সালে স্পেনের বিদায়ের পর স্বাধীন হতে পারেনি। মরক্কোর দখলের কারণে এটি এখনও জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত একমাত্র অ-স্বশাসিত ভূখণ্ড।
মরক্কোর 'বালির প্রাচীর' (The Berm) কী?+
এটি মরক্কো কর্তৃক নির্মিত প্রায় ২,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বালির প্রতিরক্ষা প্রাচীর। এতে রাডার, সামরিক ঘাঁটি এবং আনুমানিক ৭০ লাখেরও বেশি স্থলমাইন রয়েছে, যা দখলকৃত উপকূলীয় অঞ্চলকে পলিসারিও নিয়ন্ত্রিত মুক্ত অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
সাহরাউইরা বর্তমানে কোথায় বসবাস করে?+
সাহরাউইদের প্রায় অর্ধেক অংশ মরক্কোর কড়া সামরিক নজরদারির অধীনে পশ্চিম সাহারায় বাস করে এবং অবশিষ্ট প্রায় দেড় লাখেরও বেশি সাহরাউই আলজেরিয়ার তিনদুফ মরুভূমির ৫টি সুসংগঠিত শরণার্থী শিবিরে গত ৫০ বছর ধরে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছে।
তথ্যসূত্র ও আন্তর্জাতিক দলিল
পশ্চিম সাহারা সংকটে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করুন
আপনি কি পশ্চিম সাহারা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক আইন বা ভূ-রাজনীতি নিয়ে বিশদ গবেষণা বা মতামত লিখতে চান? মেরুনপেপারের প্ল্যাটফর্মে আপনার বিশ্লেষণ তুলে ধরুন।
লেখা পাঠান