Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন
আত্মনিয়ন্ত্রণদক্ষিণ এশিয়া / হিমালয়সামরিক নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সংকট ও দ্বিপাক্ষিক বিরোধ

কাশ্মীর সংকট: সাত দশকের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি, অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল ও হিমালয়ের রণক্ষেত্র

১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে জাতিসংঘের গণভোটের প্রস্তাব, ২০১৯-এর সাংবিধানিক আঘাত এবং দুই পারমাণবিক শক্তির মুখোমুখি অবস্থান

মেরুনপেপার ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা ডেস্ক•হালনাগাদ: ২০২৬ পর্যালোচনা
শেয়ার করুন:
সারসংক্ষেপ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

কাশ্মীর সংকট দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ। দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী—ভারত ও পাকিস্তান—উভয়েই সম্পূর্ণ কাশ্মীরকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে, যার ফলে তারা ১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালে তিনটি বড় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। তবে এই রাষ্ট্রীয় সংঘাতের আড়ালে সবচেয়ে বেশি নিষ্পেষিত হয়েছে কাশ্মীরি জনগণ, যাদেরকে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও গণভোটের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্ট ২০১৯ তারিখে ভারত সরকার সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫(এ) অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের আধা-স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয় এবং উপত্যকাটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করে বিশ্বের সবচেয়ে ঘন সামরিক নজরদারির অধীনে নিয়ে আসে।

# মূল পরিসংখ্যান ও ফ্যাক্টস

সংঘাতের বয়স
৭৮+ বছর
১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ বিভাজন ও দেশীয় রাজ্য বিতর্ক থেকে শুরু
সামরিক উপস্থিতি
৭+ লাখ সৈন্য
বিশ্বের সবচেয়ে ঘন ঘন সেনাবেষ্টিত বেসামরিক এলাকা
জাতিসংঘের অবস্থান
রেজুলেশন ৪৭
নিরাপত্তা পরিষদ নির্দেশিত গণভোটের রায় এখনও কার্যকর হয়নি
সাংবিধানিক মর্যাদা
সম্পূর্ণ বাতিল
৫ আগস্ট ২০১৯ তারিখে ৩৭০ ও ৩৫(এ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত
ঐতিহাসিক শিকড়

উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভাজনের সময় কাশ্মীর ছিল একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশীয় রাজ্য (Princely State), যার ৭৫ শতাংশের বেশি জনগণ মুসলিম কিন্তু শাসক ছিলেন হিন্দু মহারাজা হরি সিং। বিভাজনের সময় কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছাকে অবজ্ঞা করে ভারত বা পাকিস্তানের যেকোনো একটির সাথে যুক্ত হওয়ার চাপ আসে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে পশতুন উপজাতিদের আক্রমণের মুখে মহারাজা ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চান এবং বিনিময়ে বিতর্কিত ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব একসেশন’ স্বাক্ষর করেন। ভারতীয় সেনারা উপত্যকায় প্রবেশ করলে প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে এবং নিরাপত্তা পরিষদ নির্দেশ দেয় যে নিরপেক্ষ গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরিরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে—যা গত পৌনে এক শতাব্দীতেও বাস্তবায়িত হয়নি।

ঐতিহাসিক কালরেখা ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ

১৯৪৭

দেশভাগ ও বিতর্কিত অন্তর্ভুক্তি

মহারাজা হরি সিং কর্তৃক ভারতে যোগদানের বিতর্কিত চুক্তি স্বাক্ষর; প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ।

১৯৪৮

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রেজুলেশন ৪৭

কাশ্মীরি জনগণের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লক্ষ্যে গণভোটের ঐতিহাসিক প্রস্তাব।

১৯৮৯

কাশ্মীর উপত্যকায় সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান

ভোটে কারচুপি ও দিল্লির দীর্ঘ দমননীতির বিরুদ্ধে তরুণদের সর্বাত্মক সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা।

১৯৯৯

কারগিল যুদ্ধ

হিমালয়ের বরফাবৃত শৃঙ্গে দুই পারমাণবিক শক্তির রক্তক্ষয়ী সরাসরি সংঘাত।

২০১৯

অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ

৫ আগস্ট বিশেষ মর্যাদা বাতিল; ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারারুদ্ধ করে সরাসরি দিল্লির শাসন জারি।

২০২৪-২০২৬

নয়া জনমিতি ও নির্বাচন সত্ত্বেও উত্তেজনা

জমিন ও চাকরির সুরক্ষার আইন বিলুপ্তির পর জনমিতিক পরিবর্তনের ভয়; স্থানীয় নির্বাচনের পরও দিল্লির কড়া নিয়ন্ত্রণ বজায়।

ক্ষমতার মানচিত্র

মূল পক্ষ ও অংশীদারদের ভূমিকা

কাশ্মীরি জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তি

আদিবাসী অংশীদার
আক্রান্ত ভূখণ্ডের মূল অংশীদার

অবস্থান ও কৌশল: আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা ও জমি-সংস্কৃতির সুরক্ষা

ভারত সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী

সার্বভৌম প্রশাসন
নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় শক্তি

অবস্থান ও কৌশল: কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ; সন্ত্রাসবাদ দমন ও সম্পূর্ণ একীভূতকরণ

নেতৃত্ব/প্রতিনিধি: নরেন্দ্র মোদী সরকার

পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনী

প্রতিবেশী দাবিদার
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী পক্ষ

অবস্থান ও কৌশল: কাশ্মীরকে অসমাপ্ত দেশভাগের অংশ মনে করা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে কাশ্মীরিদের সমর্থন প্রদান

চীন (লাদাখ ও আকসাই চীন ফ্রন্ট)

সীমান্তবর্তী শক্তি
তৃতীয় প্রতিবেশী অংশীদার

অবস্থান ও কৌশল: আকসাই চীনের নিয়ন্ত্রণ এবং লাদাখ সীমান্তে ভারতের একতরফা পরিবর্তনের বিরোধিতা

আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো

মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতা

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রেজুলেশন ৪৭ ও ৯১

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে যে কাশ্মীরের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণভোটের মাধ্যমে। কোনো পক্ষ একতরফাভাবে এই অঞ্চলের চরিত্র পরিবর্তন করতে পারে না।

রেফারেন্স: UNSCR 47 (1948) & UNSCR 91 (1951)

জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় (OHCHR) ঐতিহাসিক কাশ্মীর রিপোর্ট

২০১৮ ও ২০১৯ সালের জাতিসংঘ রিপোর্টে কাশ্মীর উপত্যকায় নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং প্যালেট গানের ব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করা হয়।

রেফারেন্স: OHCHR Reports on Kashmir (2018, 2019)
বৈশ্বিক সমীকরণ

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও পরাশক্তিদের ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক ফ্ল্যাশপয়েন্ট

বিশ্বের একমাত্র অঞ্চল যেখানে তিনটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ (ভারত, পাকিস্তান ও চীন) সরাসরি অভিন্ন সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে। কাশ্মীর সীমান্তে যেকোনো ভুল বোঝাবুঝি বৈশ্বিক পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করে।

সিন্ধু অববাহিকার জল নিরাপত্তা

সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদী কাশ্মীর হয়ে পাকিস্তানে প্রবাহিত। ফলে কাশ্মীর কেবল ভূমির লড়াই নয়; এটি কোটি কোটি মানুষের অস্তিত্বের জন্য পানির অধিকারের ভূ-রাজনীতি।

জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধান

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

অনুচ্ছেদ ৩৭০ কী ছিল এবং কেন এটি বাতিল করা হলো?+

অনুচ্ছেদ ৩৭০ ভারতীয় সংবিধানের অধীনে জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজস্ব সংবিধান, পতাকা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিয়েছিল। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার এটি বাতিল করে এই যুক্তিতে যে এটি কাশ্মীরকে ভারতের সাথে পূর্ণ একীভূত হতে বাধা দিচ্ছিল এবং অঞ্চলটিতে সন্ত্রাসবাদ উস্কে দিচ্ছিল।

কাশ্মীরে কেন কখনও জাতিসংঘ গণভোট হতে পারল না?+

জাতিসংঘের শর্ত ছিল প্রথমে পাকিস্তান তার সেনা সীমান্ত থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে, এরপর ভারত ন্যূনতম বাহিনী রেখে গণভোটের আয়োজন করবে। কিন্তু পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সেনা প্রত্যাহার না করায় সেই গণভোট কখনোই অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। পরবর্তীতে ভারত এটিকে তার অভ্যন্তরীণ বিষয় দাবি করে গণভোটের কার্যকারিতা প্রত্যাখ্যান করে।

আজাদ কাশ্মীর এবং ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মধ্যে পার্থক্য কী?+

১৯৪৭-৪৮ সালের যুদ্ধের পর যে অংশটি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকে তাকে 'আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর' এবং 'গিলগিট-বালতিস্তান' বলা হয়। আর অবশিষ্ট অংশটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। উভয় অংশকে পৃথক করেছে প্রায় ৭৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা’ (Line of Control বা LoC)।

তথ্যসূত্র ও আন্তর্জাতিক দলিল

মুক্ত মতামতের আহ্বান

কাশ্মীর সংকটে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করুন

আপনি কি কাশ্মীর পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক আইন বা ভূ-রাজনীতি নিয়ে বিশদ গবেষণা বা মতামত লিখতে চান? মেরুনপেপারের প্ল্যাটফর্মে আপনার বিশ্লেষণ তুলে ধরুন।

লেখা পাঠান

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।