Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন
গণতান্ত্রিক প্রতিরোধদক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসামরিক জান্তা বিরোধী বহুমুখী সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ

মিয়ানমার সংকট: সামরিক জান্তার পতনযাত্রা ও গণতন্ত্রের সশস্ত্র লড়াই

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর জনগণের ঐক্য সরকার (NUG), পিপলস ডিফেন্স ফোর্স এবং নৃতাত্ত্বিক বাহিনীর নজিরবিহীন প্রতিরোধ

মেরুনপেপার ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা ডেস্ক•হালনাগাদ: ২০২৬ পর্যালোচনা
শেয়ার করুন:
সারসংক্ষেপ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

মিয়ানমারের ইতিহাস বহুলাংশে সামরিক আধিপত্য, নৃতাত্ত্বিক অসন্তোষ এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভ্যুত্থান দেশটিকে এক সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে নির্মমভাবে দমন করার পর সাধারণ তরুণ, পেশাজীবী এবং ছাত্ররা অস্ত্র হাতে তুলে নেয় এবং ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স’ (PDF) গড়ে তোলে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক নৃতাত্ত্বিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো (EAOs) অভূতপূর্ব সামরিক সমন্বয় গড়ে তোলে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ১০২৭’ মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ভিত কাঁপিয়ে দেয়, যার ফলে তারা দেশের অর্ধেকেরও বেশি ভৌগোলিক এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারায়।

# মূল পরিসংখ্যান ও ফ্যাক্টস

অভ্যুত্থানের সময়কাল
৫+ বছর
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সামরিক জান্তার অবৈধ ক্ষমতা দখল
অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত
৩০+ লাখ
সেনাবাহিনীর বিমান হামলা ও গ্রামে অগ্নিসংযোগের ফলে গৃহহীন
জান্তা নিয়ন্ত্রণের পতন
৬০% হ্রাস
সীমান্তবর্তী রাজ্য ও প্রধান বাণিজ্য পথগুলো প্রতিরোধ জোটের দখলে
রোহিঙ্গা শরণার্থী
১২+ লাখ
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিক
ঐতিহাসিক শিকড়

উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন

১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই মিয়ানমার (পূর্বে বার্মা) কারেন, কাচিন, শানসহ একাধিক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসনের দাবির মুখে পড়ে। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটিতে কয়েক দশকের প্রত্যক্ষ সামরিক শাসনের সূচনা হয়। ১৯৮৮ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে অং সান সু চির রাজনৈতিক উত্থান সত্ত্বেও সেনাবাহিনী রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রয়ে যায়। ২০০৮ সালের সংবিধানে সেনাবাহিনী নিজেদের জন্য সংসদের ২৫% আসন এবং স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর একক কর্তৃত্ব সংরক্ষিত রাখে। ২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (NLD) বিপুল বিজয় লাভ করলেও সেনাপ্রধানরা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ২০২০-এর ফলাফল বাতিল করে অভ্যুত্থান ঘটায়।

ঐতিহাসিক কালরেখা ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ

১৯৬২

প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান

জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল এবং 'বার্মিজ ওয়ে টু সোশ্যালিজম' চালুর মাধ্যমে মিয়ানমারকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

১৯৮৮

৮৮৮৮ গণ-অভ্যুত্থান

গণতন্ত্রের দাবিতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলন; হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং সু চির জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ।

২০১৭

রোহিঙ্গা গণহত্যা ও জাতিগত নিধন

রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নারকীয় অভিযান; ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পলায়ন এবং আইসিজে-তে মামলা।

২০২১

১ ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থান

নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতা দখল; দেশব্যাপী ঐতিহাসিক 'সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্ট' (CDM) শুরু।

২০২৩-২০২৪

অপারেশন ১০২৭ এর বিস্ময়

থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের অপ্রতিরোধ্য অগ্রাভিযান; শান রাজ্য ও চীন সীমান্তবর্তী বহু শহর ও জান্তা সামরিক ঘাঁটির পতন।

২০২৫-২০২৬

রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশ ও ভারত সংলগ্ন রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ শহর মুক্ত; জান্তা শাসনের চূড়ান্ত প্রান্তসীমা।

ক্ষমতার মানচিত্র

মূল পক্ষ ও অংশীদারদের ভূমিকা

স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল (SAC / জান্তা)

সামরিক জান্তা
ক্ষমতাদখলকারী সামরিক নেতৃত্ব

অবস্থান ও কৌশল: বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শাসন টিকিয়ে রাখা ও বিরোধী দমন

নেতৃত্ব/প্রতিনিধি: সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং

জাতীয় ঐক্য সরকার (NUG)

নির্বাচিত ছায়া সরকার
নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও নাগরিক সমাজের সমান্তরাল সরকার

অবস্থান ও কৌশল: সামরিক জান্তার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ও ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠন

নেতৃত্ব/প্রতিনিধি: ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দুওয়া লাশি লা

পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (PDF)

সশস্ত্র প্রতিরোধ
নাগরিক সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী

অবস্থান ও কৌশল: স্থানীয় পর্যায়ে জান্তা ঘাঁটিতে গেরিলা আক্রমণ ও অঞ্চল রক্ষা

থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স ও নৃতাত্ত্বিক বাহিনী (EAOs)

নৃতাত্ত্বিক মিত্রজোট
আরাকান আর্মি (AA), টা'আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (TNLA), এমএনডিএএ

অবস্থান ও কৌশল: ঐতিহাসিক স্বায়ত্তশাসন রক্ষা এবং জান্তা সেনাবহিনীর উচ্ছেদ

চীন ও আঞ্চলিক পরাশক্তি

আঞ্চলিক প্রভাবক
সীমান্ত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষক

অবস্থান ও কৌশল: দ্বিমুখী কূটনীতি — জান্তা ও শক্তিশালী সীমান্ত বিদ্রোহী উভয় পক্ষের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা

আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো

মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতা

রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলা (ICJ - গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার)

জাতিসংঘের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়াধীন এবং জান্তাকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রেফারেন্স: Application of Genocide Convention (The Gambia v. Myanmar)

যুদ্ধাপরাধ ও বেসামরিকদের ওপর বিমান হামলা

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসারে জনবসতি, বিদ্যালয়, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং হাসপাতালে বিমান থেকে ভারী বোমা বর্ষণ সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ।

রেফারেন্স: Geneva Conventions Additional Protocol I
বৈশ্বিক সমীকরণ

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও পরাশক্তিদের ভূমিকা

বাংলাদেশ সীমান্ত ও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান

রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ফলে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার ও জান্তা কার্যত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

চীনের বঙ্গোপসাগর করিডোর (CMEC)

মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত পাইপলাইন ও রেল সংযোগ বেইজিংয়ের জন্য কৌশলগত জীবনরেখা।

জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধান

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

২০২১ সালে মিয়ানমারে হঠাৎ অভ্যুত্থান হওয়ার কারণ কী?+

২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চির দল ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পায়, যা সামরিক বাহিনীর নিজস্ব রাজনৈতিক দলের চরম পরাজয় ডেকে আনে। এর ফলে সাংবিধানিক ক্ষমতা খর্ব হওয়ার ভয়ে এবং সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ব্যক্তিগত ক্ষমতা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষায় সেনাবাহিনী কাল্পনিক কারচুপির অজুহাতে ক্ষমতা দখল করে।

অপারেশন ১০২৭ কী এবং এটি কেন এত তাৎপর্যপূর্ণ?+

২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর উত্তর শান রাজ্যে তিনটি শক্তিশালী নৃতাত্ত্বিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী (এমএনডিএএ, টিএনএলএ এবং আরাকান আর্মি) একত্রিত হয়ে যে যৌথ অভিযান শুরু করে, তাকে 'অপারেশন ১০২৭' বলা হয়। এটি সামরিক জান্তাকে শত শত ফাঁড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট থেকে উৎখাত করে জান্তার অজেয় ভাবমূর্তি চিরতরে ভেঙে দেয়।

পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (PDF) কাদের নিয়ে গঠিত?+

পিডিএফ মূলত মিয়ানমারের সাধারণ তরুণ, ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং পেশাজীবীদের নিয়ে গঠিত, যারা সামরিক অভ্যুত্থানের পর অহিংস বিক্ষোভ রক্তাক্ত উপায়ে দমিত হওয়ার পর অস্ত্র হাতে জান্তা হটানোর শপথ নিয়েছে।

মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?+

মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। সে দেশে স্থায়ী শান্তি ও গণতন্ত্র না ফিরলে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। এছাড়া সীমান্তবর্তী সশস্ত্র সংঘাতের অভিঘাত বারবার বাংলাদেশের টেকনাফ ও বান্দরবান সীমান্তে এসে পৌঁছায়।

তথ্যসূত্র ও আন্তর্জাতিক দলিল

মুক্ত মতামতের আহ্বান

মিয়ানমার সংকটে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করুন

আপনি কি মিয়ানমার পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক আইন বা ভূ-রাজনীতি নিয়ে বিশদ গবেষণা বা মতামত লিখতে চান? মেরুনপেপারের প্ল্যাটফর্মে আপনার বিশ্লেষণ তুলে ধরুন।

লেখা পাঠান

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।