সুদান ট্র্যাজেডি: সেনাবাহিনীর বনাম আরএসএফ গৃহযুদ্ধ, দারফুর নিধন ও নীরব দুর্ভিক্ষ
২০১৯ সালে বশিরের পতনের পর দুই জেনারেলের ক্ষমতার লোভ, ধ্বংসস্তূপে খার্তুম এবং এক কোটির বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুতি
২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সুদানের রাজধানী খার্তুমে হঠাৎ শুরু হওয়া ক্ষমতার রক্তক্ষয়ী সংঘাত অল্প সময়ের মধ্যেই আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম দেশকে এক ধ্বংসাত্মক ও বর্বর গৃহযুদ্ধের নরকে পরিণত করে। এই লড়াই কোনো মতাদর্শিক বা নাগরিক মুক্তি আন্দোলন নয়; এটি মূলত সুদানের দুই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার অহংবোধ, লোভ ও একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দখলের লড়াই। একপক্ষে সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর (SAF) প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান, অপরপক্ষে কুখ্যাত প্যারা-মিলিটারি বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (RSF)-এর প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালো (যিনি ‘হেমেদতি’ নামে পরিচিত)। এই যুদ্ধের ফলে ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ নিজ বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হয়ে বিশ্বের সর্বকালের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির রেকর্ড তৈরি করেছে এবং দারফুর অঞ্চলে পুনরায় জাতিগত নিধন ও গণহত্যার বিভীষিকা নেমে এসেছে।
# মূল পরিসংখ্যান ও ফ্যাক্টস
উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন
১৯৫৬ সালে ব্রিটিশ-মিশরীয় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই সুদান অবিরাম অভ্যুত্থান ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৮৯ সালে জেনারেল ওমর আল-বশির ইসলামপন্থী সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে তিন দশক ধরে দেশটিতে লৌহকঠিন একনায়কত্ব চালান। বশির সরকারের আমলেই ২০০৩ সালে পশ্চিমের দারফুর অঞ্চলে অ-আরব জনগোষ্ঠীর ওপর নারকীয় গণহত্যা চালানোর জন্য ‘জানজাবীদ’ মিলিশিয়া বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে বর্তমান ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (RSF)-এ পরিণত হয়। ২০১৯ সালে সুদানের সাহসী ছাত্র ও নারীদের নেতৃত্বে অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনী বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাধ্য হয়। কিন্তু বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বুরহান ও হেমেদতি যৌথভাবে ২০২১ সালে আরেক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের স্বপ্ন চুরমার করে এবং পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
ঐতিহাসিক কালরেখা ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ
ওমর আল-বশিরের ক্ষমতা দখল
ইসলামপন্থী সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বশিরের দীর্ঘ তিন দশকের স্বৈরশাসনের সূচনা।
দারফুর গণহত্যা ও জানজাবীদ
পশ্চিম সুদানের বিদ্রোহীদের দমনে সরকারের কুখ্যাত মিলিশিয়া লেলিয়ে দেওয়া; ৩ লাখের বেশি প্রাণহানি।
দক্ষিণ সুদানের বিচ্ছিন্নতা
গণভোটের মাধ্যমে খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা এবং সুদানের ৭৫% তেল রাজস্ব হারানো।
ঐতিহাসিক সুদান বিপ্লব ও বশিরের পতন
রুটির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনীর হাতে বশির ক্ষমতাচ্যুত; গণতন্ত্রের ক্ষণস্থায়ী আশা।
যৌথ সামরিক অভ্যুত্থান
জেনারেল বুরহান ও হেমেদতির যৌথ অভ্যুত্থানে বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী আবদাল্লা হামদোক ক্ষমতাচ্যুত।
সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধ ও নীরব মহাদুর্ভিক্ষ
আরএসএফ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে খার্তুম, দারফুর ও গেজিরা রাজ্যে সর্বাত্মক সংঘাত; কোটি কোটি মানুষের অনাহার ও বিশ্বের নীরবতা।
মূল পক্ষ ও অংশীদারদের ভূমিকা
সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (SAF)
জাতীয় সেনাবাহিনীঅবস্থান ও কৌশল: বিদ্রোহী আরএসএফকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ রক্ষা
র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)
প্যারা-মিলিটারি বাহিনীঅবস্থান ও কৌশল: খার্তুম ও দারফুরের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে সুদানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা
সুদানের গণতন্ত্রকামী নাগরিক সমাজ ও রেজিস্ট্যান্স কমিটি
নাগরিক সমাজঅবস্থান ও কৌশল: উভয় জেনারেলের বিচার, যুদ্ধের তাৎক্ষণিক অবসান ও বেসামরিক গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থান্বেষী শক্তি
আন্তর্জাতিক প্রভাবকঅবস্থান ও কৌশল: ইউএই, রাশিয়া (সাবেক ওয়াগনার), মিশর প্রমুখের প্রক্সি অস্ত্র সরবরাহ
মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতা
দারফুরে গণহত্যার পুনরাবৃত্তি ও আইসিসির তদন্ত
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে দারফুরে বেসামরিক মাসালিত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আরএসএফ কর্তৃক সংঘটিত ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও জাতিগত হত্যা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার যুদ্ধাপরাধ
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও নিরাপত্তা পরিষদ রেজুলেশন ২৪১৭ অনুযায়ী বেসামরিক জনগণের জন্য খাদ্য ও ওষুধ প্রবেশে ইচ্ছাকৃত বাধা সৃষ্টি করা যুদ্ধাপরাধের শামিল।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও পরাশক্তিদের ভূমিকা
লোহিত সাগরের বন্দর ও রাশিয়ার নৌঘাঁটির আকাঙ্ক্ষা
পোর্ট সুদান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত লোভনীয়। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে এখানে নৌঘাঁটি করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় শক্তিগুলো কৃষিজমি ও বন্দরের ওপর নজর রাখছে।
সুদানের অবৈধ সোনার বাণিজ্য ও বিদেশি অর্থায়ন
দারফুর ও উত্তরের সোনার খনিগুলোর অধিকাংশই হেমেদতির নিয়ন্ত্রণে, যা দুবাই ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পাচার হয়ে যুদ্ধের প্রধান অর্থায়নে রূপ নিয়েছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
সুদানের এই গৃহযুদ্ধ কেন শুরু হলো?+
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক চাপে সুদানকে পুনরায় বেসামরিক শাসনে ফেরানোর রূপরেখা তৈরি হয়। সেখানে প্রধান শর্ত ছিল আরএসএফ বাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর সাথে একীভূত করা। কতদিনের মধ্যে একীভূত হবে এবং কে কার অধীনে থাকবে—এই নিয়ে সেনাপ্রধান বুরহান ও আরএসএফ প্রধান হেমেদতির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ২০২৩ সালের এপ্রিলে যুদ্ধ শুরু হয়।
আরএসএফ (RSF) আসলে কারা?+
আরএসএফ হলো ২০০৩ সালে দারফুরে গণহত্যা চালানোর জন্য স্বৈরশাসক বশির কর্তৃক গঠিত ‘জানজাবীদ’ ঘোড়সওয়ার মিলিশিয়াদের আধুনিক রূপ। পরে বশির তাদের রাষ্ট্রীয় আধা-সামরিক মর্যাদা দেন এবং হেমেদতি সোনার খনি ও ভাড়াটে সৈন্য পাঠানোর মাধ্যমে বিপুল ধনসম্পদের মালিক হন।
সুদান সংকটকে কেন বিশ্বের সবচেয়ে উপেক্ষিত সংকট বলা হয়?+
যদিও সুদানে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং এটি বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনাহার সংকট, তা সত্ত্বেও ইউক্রেন বা গাজার মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও পশ্চিমা দাতাদের মনোযোগ সুদান পায়নি। প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মানবিক ত্রাণের মাত্র ৩০ শতাংশ তহবিল এখন পর্যন্ত সংগৃহীত হয়েছে।
তথ্যসূত্র ও আন্তর্জাতিক দলিল
সুদান সংকটে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করুন
আপনি কি সুদান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক আইন বা ভূ-রাজনীতি নিয়ে বিশদ গবেষণা বা মতামত লিখতে চান? মেরুনপেপারের প্ল্যাটফর্মে আপনার বিশ্লেষণ তুলে ধরুন।
লেখা পাঠান