২০২৩ সালের ৩১ জুলাই ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত নুহ (মেওয়াত) জেলা থেকে শুরু করে সাইবার সিটি গুরুগ্রাম পর্যন্ত এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দুত্ববাদী উগ্র সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দলের অস্ত্রসজ্জিত শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই সহিংসতায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়। বিশ্বখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তি ও বহুজাতিক কর্পোরেটের কেন্দ্র গুরুগ্রামে মসজিদ পুড়িয়ে দেওয়া এবং ইমামকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা আধুনিক ভারতের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার কফিনে আরেকটি নির্মম পেরেক ঠুকে দেয়।
সহিংসতার মূল অনুঘটক: মনু মানেসারের উসকানি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
হরিয়ানার নুহের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেছে মনু মানেসার (মোহিত যাদব) নামের এক কুখ্যাত তথাকথিত 'গোরক্ষক' নেতা। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজস্থানে নাসির ও জুনায়েদ নামের দুই নিরীহ মুসলিম যুবককে অপহরণ করে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় এই মনু মানেসার ছিল প্রধান পলাতক আসামি।
ভিএইচপি কর্তৃক আয়োজিত ব্রিজ মন্ডল জলাভিষেক যাত্রার প্রাক্কালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনু মানেসার ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে ভিডিও বার্তা প্রচার করে দম্ভভরে ঘোষণা দেয় যে, সে এই শোভাযাত্রায় সশরীরে উপস্থিত থাকবে এবং মেওয়াতের মুসলমানদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। এই চরম উসকানিমূলক বার্তা স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের জন্ম দেয়। যদিও মনু মানেসার নিজে শেষ পর্যন্ত শোভাযাত্রায় আসেনি, কিন্তু তার তৈরি করা উত্তেজনার বারুদে সফলভাবেই অগ্নিসংযোগ ঘটেছিল।
সহিংসতার কালপঞ্জি: নুহ থেকে গুরুগ্রাম
৩১ জুলাই দুপুরে নুহের এডওয়ার্ড চক থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী বহু হিন্দুত্ববাদী কর্মীর হাতে ছিল তলোয়ার, দেশি বন্দুক ও লাঠিসোঁটা। মেওয়াতের সংখ্যালঘু জনবসতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় আক্রমণাত্মক স্লোগান ও সশস্ত্র মহড়ার কারণে উভয়পক্ষের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা এবং পরবর্তীতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।
বহুমাত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যেখানে নানা ধর্ম ও মতের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ বিষয়ে উদ্বেগের পারদ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী...
মুহূর্তের মধ্যে পুরো শহর রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। অসংখ্য গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষের সময় শান্তি রক্ষার দায়িত্বে থাকা দুই হোমগার্ড কর্মী নিহত হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রশাসন দ্রুত সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে কারফিউ জারি এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

ভারতে কীভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে নিপীড়ন করা হচ্ছে?
নুহ থেকে এই সহিংসতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী দিল্লির লাগোয়া অর্থনৈতিক হাব গুরুগ্রাম ও সোহনায়। সেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জনতা সংগঠিতভাবে মুসলিম মালিকানাধীন দোকানপাট, রেস্তোরাঁ ও মাংসের দোকানগুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। বাহাদুরগড়ে বজরং দলের মিছিলে প্রকাশ্যে স্লোগান দেওয়া হয়—"দেশ কে গাদ্দারোঁ কো, গোলি মারো সালোঁ কো" (দেশের গদ্দারদের গুলি করো)।
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
আঞ্জুমান মসজিদে হামলা ও তরুণ ইমাম মাওলানা সাদ হত্যা
১ আগস্ট দিবাগত মধ্যরাতে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৭-এ অবস্থিত আঞ্জুমান মসজিদে প্রায় দেড় শতাধিক সশস্ত্র উগ্রবাদী হামলা চালায়। এটি ছিল গুরুগ্রামের হাতে গোনা কয়েকটি সরকারিভাবে স্বীকৃত মসজিদের অন্যতম, যেখানে জুমার নামাজ বন্ধ করার জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা দীর্ঘদিন ধরে পায়তারা চালাচ্ছিল।
হামলাকারীরা মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ভেতরে অবস্থানরত ১৯ বছর বয়সী নায়েবে ইমাম মাওলানা সাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায় ও ছুরি দিয়ে কুপিয়ে বুক ক্ষতবিক্ষত করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আক্রমণকারীরা 'জয় শ্রী রাম' ধ্বনি দিয়ে মুসলমানদের জবাই করার হুমকি দিচ্ছিল।

এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর আতঙ্কিত হয়ে গুরুগ্রামের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও আইটি ফার্মগুলো তাদের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেয়, যা ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু সংবিধানের মৌল কাঠামো ধ্বংস করতে পারে না। আনোয়ার হোসেন চৌধুরী মামলা থেকে ষোড়শ সংশোধনী পর্যন্ত বাংলাদেশের মৌল কাঠামো তত্ত্বের আইনি বিকাশ বিশ্লেষণ।
মণিপুরে জাতিগত দাঙ্গা ২০২৩: রাষ্ট্রীয় মদদ ও রক্তাক্ত সংঘাতের নেপথ্যে
রাষ্ট্রীয় পক্ষপাত, বুলডোজার নীতি এবং বিচারহীনতা
সহিংসতা পরবর্তী সময়ে হরিয়ানার বিজেপি সরকার নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবর্তে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপরই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়। নুহের শত শত বাড়িঘর, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও দরিদ্র মানুষের ঝুপড়ি উচ্ছেদ অভিযানের নামে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপ করে বুলডোজার অভিযান স্থগিত করে এবং রাজ্য সরকারকে সরাসরি প্রশ্ন করে—"রাজ্য কি আইনের শাসনের আড়ালে জাতিগত নিধনযজ্ঞ (Ethnic Cleansing) চালাচ্ছে?"
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো স্পষ্ট করে বলেছে যে, বিজেপি শাসনামলে ভারতের পুলিশ ও প্রশাসনিক কাঠামো উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ভুক্তভোগী সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ২০০২ সালের গুজরাট গণহত্যা কিংবা ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার মতো হরিয়ানার ঘটনাও প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় মদদে অপরাধীরা একপ্রকার আইনি দায়মুক্তি উপভোগ করছে।

ভারত জোড়ো যাত্রা: ভারতের ভবিষ্যৎ রক্ষায় ঐক্যের ডাক কতটা কার্যকর?
উপসংহার: চরম বিপদে ভারতের বহুত্ববাদী আত্মা
২০২৩ সালের হরিয়ানা দাঙ্গা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ভারতকে একটি 'হিন্দু রাষ্ট্রে' পরিণত করার আগ্রাসী রাজনীতির অনিবার্য পরিণতি। যখন কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রশাসন উগ্রবাদী তাণ্ডবের সামনে নতি স্বীকার করে এবং নিজ দেশের বিশ কোটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনিরাপদ করে তোলে, তখন সেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা মহাকাশ বিজয় অর্থহীন হয়ে পড়ে। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ধর্মীয় বিদ্বেষের অবিলম্বে অবসান ঘটাতে হবে এবং সকল নাগরিকের সাংবিধানিক সম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।




