মৃত্যুকালীন ঘোষণা হলো এমন একটি সাক্ষ্য যা একজন ব্যক্তি তার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে তার মৃত্যুর কারণ বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রদান করে। সাক্ষ্য আইনে মৃত্যুকালীন ঘোষণার ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে, একজন ব্যক্তির সাক্ষ্য তার অনুপস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে, মৃত্যুকালীন ঘোষণা একটি বিশেষ ব্যতিক্রম।শুধুমাত্র ঘোষণাপ্রদানকারী ব্যক্তির মৃত্যুর পরই মৃত্যুকালীন ঘোষণা গ্রহনযোগ্য হয়। এই নিবন্ধে মৃত্যুকালীন ঘোষণার সংজ্ঞা, ঐতিহাসিক ভিত্তি, ঘোষণা প্রদানের নিয়ম এবং ঘোষণাপ্রদানকারী মৃত্যুবরণ না করলে তার ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব।
মৃত্যুকালীন ঘোষণা কাকে বলে?
মৃত্যুকালীন ঘোষণা বা Dying Declaration হলো এমন একটি সাক্ষ্য যা একজন ব্যক্তি তার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে তার মৃত্যুর কারণ বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেয়। একজন মৃত ব্যক্তি তার মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর কারণ, অবস্থা, এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে যে জবানবন্দি প্রদান করেন তাকেই মৃত্যুকালীন ঘোষণা বলে। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ৩২(১) ধারা অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি মৃত্যুর সম্মুখীন হয়ে তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে যে বিবৃতি প্রদান করে তাকে মৃত্যুকালীন ঘোষণা বা Dying Declaration বলে। যেমনঃ রহিম করিমকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে, রহিমের অত্যাচারেই করিমের মৃত্যু হয়েছে কিনা। করিম মৃত্যুর আগে মৃত্যুর কারণ হিসেবে রহিমের পাশবিক অত্যাচারের কথা ডাক্তারের কাছে একতি বিবৃতি প্রদান করে গেছে। করিমের এমন বিবৃতিই মৃত্যুকালীন ঘোষণা নামে পরিচিত।

সাক্ষ্য আইনের ৩২(১) ধারায় বলা হয়েছে যে, যেসব ক্ষেত্রে কোন মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে সেক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বা ঘটনার যে অবস্থার ফলে তার মৃত্যু ঘটেছে সে সংক্রান্ত কোন অবস্থা সম্পর্কে যদি কোন বিবৃতি দেয়, তাহলে সেই বিবৃতি দেয়ার সময় বিবৃতি দাতার মৃত্যুর আশংকা উপস্থিত থাকুক না থাকুক এবং যে মামলায় তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে তার ধরণ যাই হোক না কেন, উক্ত বিবৃতি প্রাসঙ্গিক। এই ধারা অনুসারে, ঘোষণা মৌখিক বা লিখিত হতে পারে, এবং ঘোষণাকারী ব্যক্তি মারা যাওয়ার আশংকা করছিলেন কিনা তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো বিবৃতি বা ঘোষণাটি অবশ্যই মৃত্যুর কারণ বা পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত হতে হবে। আদালতকে ঘোষণাটি সাবধানতার সাথে পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করার আগে বিবৃতি প্রদানে স্বতঃস্ফূর্ততা, সত্যতা এবং নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে হবে।
সাক্ষ্য কাকে বলে? সাক্ষ্য কত প্রকার ও কি কি?
মৃত্যুকালীন ঘোষণার ভিত্তি
রোমান আইনে, মৃত্যুকালীন ঘোষণার ধারণাটি Nuncupative wills বা “মৃত্যুশয্যায় অপেক্ষারত ব্যক্তির মৌখিক ইচ্ছা ঘোষণার” নামে পরিচিত। প্রাচীন গ্রিসে, মৃত্যুকালীন ঘোষণা আইনি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল। ইসলামী আইনেও এমন ঘোষণার বিধাণ আছে, বিশেষত সম্পত্তি লেনদেনের ক্ষেত্রে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী মৃত্যুকালীন ঘোষণাকে ‘মারজিউল মওত’ বলা হয়। ইসলামি বিধান অনুযায়ী মৃত্যুকালীন ঘোষণার মাধ্যমে কোন ব্যক্তি সম্পদ দান করে যেতে পারেন।
“মৃত্যুশয্যায় শায়িত একজন ব্যক্তি নিশ্চই মিথ্যা বলতে পারেন না”, এই ধারণাটিই মৃত্যুকালীন ঘোষণার ভিত্তি। এই ধারণার প্রতিফলন ঘটেছে ল্যাটিন ম্যাক্সিম Nemo Moriturus Praesumitur Mentire”- তে, যার ইংরেজি অর্থ হচ্ছে, “a person about to die is presumed not to lie.” অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছেন, তিনি মিথ্যা বলবেন না। উদাহরণস্বরূপ, বলা যায়, মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে নিতে অস্বীকার করায় অভিযুক্তরা নুসরাত জাহান রাফি (১৯) নামে এক ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করে। মৃত্যুশয্যায় তিনি তার আক্রমণকারীদের সনাক্ত করেছিলেন এবং বর্ণনা করেছিলেন যে কীভাবে তারা তার উপর কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। তার এই মৃত্যুকালীন ঘোষণা অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা যাচাই করে ১৬ জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
মৃত্যুকালীন ঘোষণার অপরিহার্য শর্তাবলী
মৃত্যুকালীন ঘোষণা দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় মামলার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য। তবে, মৃত্যুকালীন ঘোষণা হিসেবে কোন বিবৃতি আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা নির্ভর করে বিশেষ কিছুর শর্তের ওপর। এসব শর্ত পূরণ করলেই কেবল কোন একটি বিবৃতি মৃত্যুকালীন ঘোষণা হিসেবে আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে। শর্তগুলো নিম্নরূপঃ
- মৃত্যুকালীন ঘোষণা প্রদানকারী ব্যক্তিকে মৃত্যুকালীন ঘোষণার অব্যবহিত পরে অবশ্যই মৃত্যুবরণ করতে হবে।
- মৃত্যুকালীন ঘোষণা প্রদানকারী ব্যক্তিরই মৃত্যু তদন্ত ও মামলার বিচার্য বিষয় হতে হবে।
- মৃত্যুর পূর্বেই ঘোষণাকারী ব্যক্তি তার মৃত্যূর কারণ, অবস্থা, এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে ঘোষণা দিয়েছেন।
কে মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করতে পারেন?
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ১৬৪ ধারার বিধান অনুযায়ীই যে মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই, যে কেউ লিপিবদ্ধ করতে পারেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা ও পুলিশ রেগুলেশন অব বেংগল, ১৯৪৩ এর ৪৬৭ বিধি অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা ও পুলিশ রেগুলেশন অব বেংগল, ১৯৪৩ এর ২৬৫ বিধি অনুযায়ী পুলিশও মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করতে পারেন। এছাড়া, ডাক্তার, চেয়ারম্যান, গ্রাম্য পুলিশসহ যেকোন ব্যক্তি মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করতে পারেন। তবে যে ব্যক্তিই মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করুক না কেন তাকে সাক্ষীর মাধ্যমে উক্ত ঘোষণা প্রমাণ করতে হয়।
সাক্ষী কাকে বলে? কে সাক্ষ্য দিতে পারে?
মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করার নিয়ম
মৃত্যুকালীন ঘোষণা মৌখিক বা লিখিত হতে পারে। মৃত্যুকালীন ঘোষণাকারীর মৃত্যুর কারণ, বৈবাহিক অবস্থা, পিতৃত্বের দাবি ইত্যাদি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। যাইহোক, মৃত্যূকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করার স্পষ্ট কিছু নিয়ম আছে। মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করার জন্য নিম্নলিখিত নিয়মাবলি অনুসরণ করতে হবেঃ
- ঘোষণাকারীর পরিচয়: ঘোষণাকারীর পরিচয় অবশ্যই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ঘোষণাকারীর নাম, বয়স, পেশা, ঠিকানা ইত্যাদি উল্লেখ করতে হবে।
- ঘোষণার ভাষাঃ ঘোষণাটি অবশ্যই ঘোষণা প্রদানকারীর নিজের কথায় লিপিবদ্ধ করতে হবে। ঘোষণা সঠিকভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে লিপিবদ্ধ করতে হবে। ঘোষণা লিপিবদ্ধ করার সময় মৃত ব্যক্তির মানসিক অবস্থা এবং শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে একটি বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে হবে।
- ঘোষণার সময়: ঘোষণাটি কবে, কখন দেওয়া হয়েছিল তা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
- ঘোষণার স্থান: ঘোষণাটি কোথায় দেওয়া হয়েছিল তা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
- ঘোষণার সাক্ষী: মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করার জন্য কমপক্ষে দুজন সাক্ষী থাকতে হবে। ঘোষণাটি কোন কোন ব্যক্তির উপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছিল তা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
- ঘোষণার বিষয়বস্তু: ঘোষণার বিষয়বস্তু স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ঘোষণাটি কী সম্পর্কে দেওয়া হয়েছিল তা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
- ঘোষণার স্বাক্ষর: ঘোষণা লিপিবদ্ধ করার পর, ঘোষণাকারীকে ঘোষণাটি পড়ে শোনাতে হবে এবং তার সাক্ষর ও টিপসই। ঘোষণার সময় উপস্থিত সাক্ষীদেরও স্বাক্ষর নিতে হবে।
মৃত্যুকালীন ঘোষণাকায় ঘোষণাকারীর মৃত্যুর কারণ, বৈবাহিক অবস্থা, পিতৃত্বের দাবি ইত্যাদি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হলেও সম্পত্তির দান সংক্রান্ত কোন ঘোষণা মৃত্যুকালীন ঘোষণা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবেনা। সম্পত্তির দান সংক্রান্ত ঘোষণা মুসলিম আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
সাক্ষী কাকে বলে? সাক্ষী কত প্রকার?
মৃত্যুকালীন ঘোষণা প্রদানের পর বেঁচে যাওয়া ঘোষণাকারীর মৃত্যুকালীন ঘোষণার ফলাফল কি?
মৃত্যুকালীন ঘোষণা প্রদানকারী ব্যক্তি ঘোষণা প্রদানের পর বেঁচে গেলে তাকে আর মৃত্যুকালীন ঘোষণা বলা যায় না। এমন ঘোষনাকে তখন Dying Disposition বলা হয়। এমন ঘোষণাকারী বেঁচে গেলে ওই বিবৃতি সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী আর গ্রহণযোগ্য হবেনা। সাক্ষ্য আইনের ৩২(১) ধারা ও পিআরবি ২৬৬ বিধি অনুযায়ী কোন ব্যক্তি মৃত্যুকালীন ঘোষণা কার্যকর হতে গেলে ঘোষণা প্রদানকারীকে অবশ্যই মৃত্যুবরণ করতে হবে। কোন আহত ব্যক্তি তার জখমের ব্যপারে কোন ঘোষণা দিলে তা মৃত্যুকালীন ঘোষণা হতে পারে যদি উক্ত ব্যক্তি পরবর্তিতে মারা যান। কিন্তু উক্ত ঘোষণার পর বেঁচে গেলে উক্ত জবানবন্দি আদালতে মৃত্যুকালীন ঘোষণা হিসেবে গণ্য হবে না। তবে মৃত্যুকালীন ঘোষণা হিসেবে এই বিবৃতি গ্রহণযোগ্য না হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে এর গ্রহণযোগ্যতা ঠিকই আছে। উক্ত বিবৃতি যদি ম্যাজিষ্ট্রেট লিপিবদ্ধ করে থাকেন তাহলে সাক্ষ্য আইনের ২৪ ধারা, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা এবং পিআরবি ৪৬৭ বিধি অনুযায়ী স্বীকৃতি বা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। পিআরবি ২৬৫ বিধি মোতাবেক, ফৌজদারি বিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী যদি পুলিশ, ডাক্তার বা অন্য ব্যক্তি কর্তৃক লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে ওই বিবৃতি ঘোষণাকারীর মৌখিক জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। এছাড়াও সাক্ষ্য আইনের ১৪৫ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুকালীন ঘোষণা পূর্ববর্তি বিবৃতিমূলক সাক্ষ্য হিসেবে এবং ১৫৭ ধারা অনুযায়ী ঘোষণাপ্রদানকারীর সমর্থনমূলক সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন যুদ্ধের ইতিহাস
সাক্ষ্য হিসেবে মৃত্যুকালীন ঘোষণাকে গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, বাস্তবতার খাতিরে। কারণ মৃত ব্যক্তি অপরাধের একমাত্র চাক্ষুষ সাক্ষী। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার খাতিরে তার সাক্ষ্য আবশ্যক, এমনকি বিচারের উদ্দেশ্যই ব্যহত হতে পারে তার বক্তব্য পরখ করে না দেখলে। আর দ্বিতীয়ত, এটাই প্রাথমিকভাবে মনে করা হয় যে, ভিন্ন কিছু প্রমাণিত না হলে, মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তি পরকালিন চিন্তায় আর মিথ্যার আশ্রয় নিবেন না। তাই আদালতে মৃত্যুকালীন ঘোষণার মর্যাদা শপথগ্রহণ পূর্বক সাক্ষ্য গ্রহণের সমান বলে মনে করা হয়।













