Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য আখ্যান: এক বিয়োগান্তক ঘটনার ব্যবচ্ছেদ

সারকথা

১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর, ভোরের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র চিরতরে বদলে গিয়েছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড দেশটির ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

রাকিবুল ইসলাম
লিখেছেন:রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশিত: ৮ আগস্ট ২০২৩•পড়তে ১২ মিনিট লাগবে
ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য আখ্যান: এক বিয়োগান্তক ঘটনার ব্যবচ্ছেদ
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের রাজধানীতে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্র চিরতরে বদলে গিয়েছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড দেশটির ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে পরিণত হয়; এই ঘটনা এমন এক ধারাবাহিক পরিস্থিতির সূচনা করেছিল যা ভারত তথা সারা বিশ্বে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই নিবন্ধটি ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অজানা কাহিনি, ঘটনাবলির জটিল বিন্যাস, রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি এবং এর পরবর্তী সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার বিষয়গুলোকে গভীর পর্যালোচনায় তুলে ধরবে।

ইন্দিরা গান্ধী কে ছিলেন?

ভারতীয় রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে অভূতপূর্ব সহিংসতা ও অস্থিরতার দাবানল জ্বালিয়েছিল। ইতিহাস যদিও তাঁর মৃত্যুর কঠোর বাস্তবতাকে নথিভুক্ত করে রেখেছে, তবুও এই ঘটনাটিকে সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি, যাতে এই দুর্ভাগ্যজনক মুহূর্তের নেপথ্যের নিয়ামকগুলোকে সম্যক উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।
ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড,
১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর এলাহাবাদে নেহরু-গান্ধী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই শক্তিশালী নেত্রী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনকারী পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করেন। পিতার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে তিনি অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ়তার সাথে রাজনীতিতে নিজের স্থান করে নেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তিনি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া এক টালমাটাল জাতিকে নেতৃত্ব দেন এবং আর্থ-সামাজিক সংকটের সময়ে নিজের কর্তৃত্ব সুসংহত করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং প্রথমবারের মতো কোনো নারী এই মর্যাদাপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার ইতিহাস গড়েন। পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও সংকল্প ছিল তাঁর নেতৃত্বের মূল বৈশিষ্ট্য। এই উত্তরণই ছিল তাঁর প্রভাবশালী রাজনৈতিক জীবনের সূচনা।

ভারত জোড়ো যাত্রা: শক্তিশালী ভবিষ্যতের জন্য ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করা

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণসমূহ

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড ছিল বহুমুখী কারণের একটি জটিল ফলাফল। এর পেছনে থাকা ঘটনাগুলো ছিল নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সমষ্টি। তাঁর হত্যাকাণ্ডের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ নিচে আলোচনা করা হলো: অপারেশন ব্লু স্টার: ১৯৮২ সালে ইন্দিরা গান্ধী অমৃতসরে শিখদের পবিত্র তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দির থেকে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিতাড়িত করার জন্য ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ নামক সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন। এই অভিযানটি অত্যন্ত বিতর্কিত ছিল এবং এর ফলে ১,২২০ জন শিখ প্রাণ হারান। বহু শিখ মনে করেছিলেন যে, অপারেশন ব্লু স্টার তাঁদের ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ওপর এক সরাসরি আঘাত। ইন্দিরা গান্ধীকে একসময় শিখদের রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখা হলেও, তারা এই অভিযানকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করেছিলেন। জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের মৃত্যু: অপারেশন ব্লু স্টারের সময় স্বর্ণমন্দিরে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে নিহত হন। তাঁর মৃত্যু ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি শিখদের ক্ষোভকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ভিন্দ্রানওয়ালে ছিলেন এক প্রভাবশালী নেতা, যার অনুসারীদের সংখ্যা ছিল বিশাল। অনেক শিখের কাছে তাঁর মৃত্যু ছিল আত্মত্যাগের প্রতীক, যা শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে আরও উগ্র করে তোলে। ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের সহানুভূতিশীল হওয়ার ধারণা: কোনো কোনো শিখ মনে করতেন যে, ইন্দিরা গান্ধী হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, যারা প্রায়শই শিখদের প্রতি বৈরী আচরণ করত। এই ধারণাকে আরও বদ্ধমূল করেছিল যে, তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধী এক হিন্দু নারীকে বিয়ে করেছিলেন। অনেকেরই ধারণা ছিল যে, ইন্দিরা গান্ধী শিখদের স্বার্থ রক্ষায় পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেননি বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজের তোষণ করেছেন। ভুল তথ্য ও গুজবের প্রসার: হত্যাকাণ্ডের আগের দিনগুলোতে ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ভুল তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। কোনো কোনো গুজবে দাবি করা হয়েছিল যে, তিনি স্বর্ণমন্দিরে পুনরায় হামলার পরিকল্পনা করছেন অথবা শিখদের ওপর দমন-পীড়ন চালাতে যাচ্ছেন। এই গুজবগুলো শিখ সম্প্রদায়ের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছিল।

ভারতের হরিয়ানায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা: ভারতে কী ঘটছে?

সম্পর্কিত বিশ্লেষণ
স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসঃ ইউরোপে ৮০০ বছরের গৌরবময় উপাখ্যান

ইউরোপের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, মধ্যযুগে যখন পুরো মহাদেশটি কুসংস্কার, অপরিচ্ছন্নতা আর অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই আইবেরীয় উপদ্বীপ বা স্পেনের বুকে জ্বলে উঠেছিল এক অনন্য সভ্যতার মশাল। মুসলমানরা এই ভূখণ্ডের নাম দিয়েছিল 'আল-আন্দালুস'।

সানজিদা সীমা • ইতিহাস
সম্পূর্ণ পড়ুন →
ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনো একটি কারণকে এককভাবে দায়ী করা অসম্ভব। তবে অপারেশন ব্লু স্টার, জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের মৃত্যু, হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রতি অনুরাগের ধারণা এবং ভুল তথ্যের প্রসার—এসবের সমন্বিত প্রভাবই যে তাঁর মৃত্যুর প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল, তা সুস্পষ্ট।

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড: এক উন্মোচিত ট্র্যাজেডি

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর সকালে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটে, যা ভারতের ইতিহাসে এক অনপনেয় চিহ্ন রেখে যায়—প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড। এটি ছিল দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক বড় মোড়, যা শিখ সম্প্রদায় এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র জাতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এর আগের দিন ভুবনেশ্বরে এক জনসভায় তাঁর দেওয়া বক্তব্য যেন এক করুণ পূর্বাভাস ছিল। সেদিন ইন্দিরা গান্ধী একটি লিখিত ভাষণ পড়ছিলেন। তবে লিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে মুহূর্তের জন্য সরে এসে তিনি তাঁর ভাগ্যে যে সহিংস পরিণতির আশঙ্কা রয়েছে, সে সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এক ধরনের অশনিসংকেত নিয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমি আজ এখানে আছি, হয়তো কাল থাকব না। আমাকে হত্যার কতবার যে চেষ্টা করা হয়েছে তা কেউ জানে না। আমি বেঁচে থাকি বা মারা যাই, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেছি এবং আমার জনগণের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরে আমি গর্বিত।”

ভারতে সংখ্যালঘুরা কীভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন?

মৌলিক লেখা আহ্বান • CONTRIBUTORS WANTED

মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন

আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।

লেখা জমা দিন →
৩০ অক্টোবর রাতে ক্লান্ত অবস্থায় ইন্দিরা গান্ধী নতুন দিল্লিতে ফেরেন। সেই রাতে তাঁর চোখে ঘুম ছিল না। তাঁর পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী পরবর্তীতে তাঁর বইতে লিখেছিলেন যে, ইন্দিরা গান্ধী শেষ রাত পর্যন্ত জেগে ছিলেন এবং তাঁর হাঁপানির ওষুধ খুঁজছিলেন। নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর উদ্বেগ ছিল স্পষ্ট, এমনকি তিনি সোনিয়াকে প্রয়োজনে তাঁকে ডাকার নির্দেশও দিয়েছিলেন। রাতের সেই নিস্তব্ধ প্রহরেও তাঁর চিন্তাজুড়ে ছিল এক গভীর শঙ্কা। ৩১ অক্টোবর সকালে যে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে, তা তাঁর এই শেষ মুহূর্তের উদ্বেগকে এক বিষাদময় বাস্তবতায় রূপ দেয়।

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর: ইন্দিরা গান্ধীর শেষ দিন

ইন্দিরা গান্ধী সকাল সাড়ে সাতটায় আইরিশ টেলিভিশনের জন্য ব্রিটিশ অভিনেতা পিটার উস্তিনভের সাক্ষাৎকার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর প্রাতঃরাশে ছিল টোস্ট, কমলালেবুর রস, ডিম এবং সিরিয়াল। ডকুমেন্টারি শুটিংয়ের জন্য তিনি কালো পাড়যুক্ত একটি জাফরান শাড়ি পরেছিলেন এবং সূক্ষ্ম প্রসাধনী ব্যবহার করেছিলেন। সকালে ইন্দিরা তাঁর নাতি-নাতনিদের বিদায় জানান। প্রিয়ঙ্কা খেয়াল করেছিলেন যে, তাঁর দাদি তাঁকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিক্ষণ জড়িয়ে ধরেছিলেন। এরপর তিনি রাহুলকে কাছে ডাকেন, যার বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। রাজীব বা সোনিয়ার কাছে যা এড়িয়ে যেতেন, এমন অনেক বিষয়ই তিনি রাহুলের সাথে শেয়ার করতেন। তিনি কিশোর রাহুলকে বলেছিলেন যেন সে “সবকিছুর দায়িত্ব নেয়” এবং তাঁর মৃত্যুতে না কাঁদে। ইন্দিরা এর আগেও রাহুলের সঙ্গে মৃত্যু নিয়ে কথা বলেছিলেন। কয়েকদিন আগেই তিনি তাঁকে শেষকৃত্যের বিষয়ে এবং নিজের জীবনের পূর্ণতার কথা জানিয়েছিলেন। ডাঃ কেপি মাথুর যখন ১ সফদরজং রোডের বাসভবনে পৌঁছালেন, তখন তাঁর প্রাতঃরাশের পর্ব শেষ। প্রতিদিনের স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে তিনি সেখানে এসেছিলেন। ইতিমধ্যে পিটার উস্তিনভ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (যা ১ আকবর রোডে অবস্থিত) তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

মোদির কি ভারতের পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস দেখে ভয় লাগে?

বিশেষ সুপারিশ
মদিনা সনদ কীঃ মদিনা সনদের প্রধান ধারা ও বিশ্ব ইতিহাসে এর গুরুত্ব বিশ্লেষণ

বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধানগুলোর অন্যতম মদিনা সনদ ইসলামি রাষ্ট্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতির অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।

সানজিদা সীমা • ইতিহাস
সম্পূর্ণ পড়ুন →
সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ইন্দিরা গান্ধী কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কনস্টেবল নারায়ণ সিং, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা রামেশ্বর দয়াল এবং ব্যক্তিগত সচিব আর কে ধাওয়ান।
ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড,
১ আকবর রোডের প্রবেশপথে পৌঁছাতেই এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। আর কে ধাওয়ানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ইন্দিরা গান্ধী যখন এগোচ্ছিলেন, তখন কনস্টেবল নারায়ণ সিং কড়া রোদ থেকে বাঁচাতে তাঁর মাথার ওপর কালো ছাতা ধরে ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী সতবন্ত সিং ও বিয়ন্ত সিং যেখানে দায়িত্বরত ছিলেন, সেই উইকেট গেট দিয়ে পার হওয়ার সময় তিনি আকস্মিকভাবে তাঁরই রক্ষীদের মুখোমুখি হন। বিয়ন্ত সিং দ্রুত তাঁর রিভলভার বের করে ইন্দিরা গান্ধীকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। প্রথম গুলিটি সরাসরি তাঁর তলপেটে আঘাত করে, এরপর আরও দুটি গুলি তাঁর বুকে বিদ্ধ হয়। এর পরপরই আরেক আক্রমণকারী সতবন্ত সিং তাঁর কারবাইন থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকেন। বিয়ন্ত সিং তাঁর ০.৩৮ (৯.৭ মিমি) রিভলভার থেকে তিনটি গুলি করেন এবং ইন্দিরা গান্ধী মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর সতবন্ত সিং তাঁর স্টার্লিং সাব-মেশিনগান থেকে ৩০ রাউন্ড গুলি চালান। এই ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা ছিল আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক।

বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি

হত্যাকাণ্ডের পরপরই সেখানে চরম বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। গুলির শব্দ শুনে ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী ছুটে আসেন এবং সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করতে থাকেন। আর কে ধাওয়ান ও পুলিশ কর্মকর্তা দীনেশ ভাট দ্রুত তাঁকে তাঁর অ্যাম্বাসেডর গাড়িতে তুলে নেন। সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক সচিব মাখনলাল ফোতেদার। তাঁরা দ্রুত তাঁকে এইমস (AIIMS) হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু দুঃখজনকভাবে পর্যাপ্ত পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জরুরি পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিল না।

সিকিম কীভাবে ভারতের অংশ হয়েছিল?

সকাল ৯টা ৩২ মিনিটে ইন্দিরা গান্ধী এইমস-এ পৌঁছান। চিকিৎসকরা কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রাণপণ লড়াই করেন এবং তাঁকে প্রায় ৮০ বোতল রক্ত দেওয়া হয়। ৩০টিরও বেশি গুলি লাগার পরও তাঁর হৃদপিণ্ড কিছুক্ষণ লড়াই চালিয়েছিল। অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের চিকিৎসকদের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি এবং দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ১ নভেম্বর সকালে ইন্দিরা গান্ধীর মরদেহ গান-ক্যারেজে করে দিল্লির রাস্তা দিয়ে তিন মূর্তি ভবনে নেওয়া হয়, যেখানে তাঁর পিতা জওহরলাল নেহরু থাকতেন এবং সেখানেই তিনি শায়িত ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী পরিস্থিতি

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে গোটা দেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। নিজের শিখ দেহরক্ষীদের দ্বারাই তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন—এই সত্যটি ট্র্যাজেডিকে আরও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে। ভারত সরকার ১ নভেম্বর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত জাতীয় শোক ঘোষণা করে এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। বিনোদন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল করা হয় এবং কয়েকদিন অফিস-আদালত বন্ধ ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানায় এবং বিশ্বনেতারা গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং বুলগেরিয়ার পক্ষ থেকে এক দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছিল, যা এই ঘটনার গভীরতাকে প্রতিফলিত করে। হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হয় এক অস্থির সময়। অপারেশন ব্লু স্টার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবের কারণে শিখ সম্প্রদায় আগে থেকেই এক সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যা এখন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, যার মূল শিকার হয়েছিল শিখরা। ১৯৮৪ সালের শিখ বিরোধী দাঙ্গা ভারতের সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের গভীর ক্ষত উন্মোচন করে। ন্যায়বিচার ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা আজও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

আরএসএস কি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য হুমকি?

ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পরবর্তী সময় ছিল ভারতের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। দিল্লি ও ভারতের অন্যান্য শহরের রাস্তাগুলো সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ এবং শিখদের ওপর লক্ষ্যবস্তু হামলায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অপারেশন ব্লু স্টারের ক্ষত শুকানোর আগেই শিখ সম্প্রদায় এমন এক নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়, যা তাদের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই সহিংসতার ভয়াবহতার তথ্য নথিভুক্ত করে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে:
১৯৮৪ সালের শিখ বিরোধী দাঙ্গা, ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড,
ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর পাঞ্জাব, দিল্লি, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও বিহারসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ১৯৮৪ সালের শিখ বিরোধী দাঙ্গা সংগঠিত হয়। জাতিগত ও ধর্মীয় নিগ্রহ, গণহত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো নারকীয় ঘটনায় এই দাঙ্গা চিহ্নিত হয়ে আছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা প্রায় ৩,৩৫০ জন, তবে বিভিন্ন নিরপেক্ষ সূত্র অনুযায়ী এই সংখ্যা ৮,০০০ থেকে ১৭,০০০-এর মধ্যে। কেবল দিল্লিতেই প্রতিশোধমূলক হামলায় ৩,০০০-এর বেশি শিখকে হত্যা করা হয়। এই পরিকল্পিত সহিংসতায় শিখরা চরম শারীরিক নিগ্রহ, সম্পত্তি ধ্বংস এবং বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়।
ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, ১৯৮৪ সালের শিখ বিরোধী দাঙ্গা,
দাঙ্গার পর সহিংসতায় উসকানিদাতাদের বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কংগ্রেস দলের তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা সজ্জন কুমারকে শিখ বিরোধী সহিংসতায় উসকানিমূলক ভূমিকার জন্য আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর পশ্চিম দিল্লিতে পাঁচ শিখকে হত্যার ষড়যন্ত্রে তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়।

ধর্মনিরপেক্ষ ভারত এবং তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার স্বরূপ

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। হত্যাকাণ্ডের দিনই তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। দাঙ্গা ও অস্থিতিশীলতার প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করে তাঁকে শান্তি ও শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকারীদের কী হয়েছিল?

একটি বিশেষ সেশন কোর্ট ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার দায়ে এক শিখ দেহরক্ষীকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং হত্যার ষড়যন্ত্রে আরও দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করে। সরকারের ভাষ্যমতে, ১৯৮৪ সালের জুন মাসে স্বর্ণমন্দিরে সেনাবাহিনীর অভিযানের প্রতিশোধ নিতে শিখরা ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল, যে ঘটনায় ১,২২০ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। তবে বিবাদীপক্ষের অভিযোগ ছিল, ইন্দিরা গান্ধীর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় তাঁর পুত্র ও উত্তরসূরি রাজীব গান্ধীর সম্পৃক্ততায় এই হত্যার ছক কষা হয়েছিল। যদিও আদালতে এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
কাউম দে হিরে, ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড,
ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকারী দুই দেহরক্ষীর জীবন নিয়ে নির্মিত পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র কাউম দে হিরে (Gems of the Community) ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে [ইয়াহু নিউজ]
আট মাসব্যাপী বিচার প্রক্রিয়ার পর জুরিবিহীন আদালতে বিচারক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, প্রসিকিউশন পক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে ৩১ অক্টোবর, ১৯৮৪ তারিখে বাগানে হাঁটার সময় সতবন্ত সিং তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন এবং কেহর সিং ও বলবীর সিং এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। আদালত তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী ঘটনাবলি ভারতীয় সমাজ ও গণস্মৃতিতে স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। এটি দেশের রাজনৈতিক, জাতিগত ও ধর্মীয় গতিপ্রকৃতির জটিল সংঘাতকে সামনে নিয়ে এসেছে এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিরসন ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতের আত্মাকে স্পর্শ করেছে। এটি শান্তির ভঙ্গুরতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দূরপ্রসারী পরিণতি এবং প্রতিকূল সময়ে ঐক্যের শক্তির এক করুণ স্মারক। ভারত যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন অতীত থেকে পাওয়া এই গভীর শিক্ষাগুলো সে সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলেছে। এই শিক্ষাগুলো এক সমষ্টিগত অঙ্গীকারের ভিত্তি—এমন এক জাতি গঠনের অঙ্গীকার যেখানে এই জাতীয় ট্র্যাজেডির ছায়া যেন আর না পড়ে এবং ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবিকতার জয়গান গীত হয়। জাতি তার ইতিহাসের মশাল হাতে নিয়ে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে শান্তি ও সম্প্রীতির আলোকে আগামীর দিনগুলো হবে আরও উজ্জ্বল।

রেটিং

(নতুন)

শেয়ার

পাঠকের মন্তব্য ও পর্যালোচনা

(০)
মন্তব্য করতে Google বা Facebook দিয়ে লগইন করা আবশ্যক
রাকিবুল ইসলাম
রাকিবুল ইসলাম

লেখক (Author)

আইন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজতত্ত্বের অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও লেখক। মেরুনপেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

আরও দেখুন →
স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসঃ ইউরোপে ৮০০ বছরের গৌরবময় উপাখ্যানইতিহাস

স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসঃ ইউরোপে ৮০০ বছরের গৌরবময় উপাখ্যান

ইউরোপের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, মধ্যযুগে যখন পুরো মহাদেশটি কুসংস্কার, অপরিচ্ছন্নতা আর অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই আইবেরীয় উপদ্বীপ বা স্পেনের বুকে জ্বলে উঠেছিল এক অনন্য সভ্যতার মশাল। মুসলমানরা এই ভূখণ্ডের নাম দিয়েছিল 'আল-আন্দালুস'।

২৮ ডিসেম্বর ২০২৫পড়ুন →
মদিনা সনদ কীঃ মদিনা সনদের প্রধান ধারা ও বিশ্ব ইতিহাসে এর গুরুত্ব বিশ্লেষণইতিহাস

মদিনা সনদ কীঃ মদিনা সনদের প্রধান ধারা ও বিশ্ব ইতিহাসে এর গুরুত্ব বিশ্লেষণ

বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধানগুলোর অন্যতম মদিনা সনদ ইসলামি রাষ্ট্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতির অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।

১৯ আগস্ট ২০২৫পড়ুন →
জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসইতিহাস

জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস

ইতিহাসের পাতায় যেসব মুহূর্ত স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তার মধ্যে বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্যতম।

১ আগস্ট ২০২৫পড়ুন →
পিকেকে-র বিলুপ্তি: তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি কুর্দিদের জন্য নতুন সংকট?ইতিহাস

পিকেকে-র বিলুপ্তি: তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি কুর্দিদের জন্য নতুন সংকট?

পিকেকে-র বিলুপ্তির ঘোষণা: তুরস্কের সামনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ, নাকি কুর্দিদের জন্য অধিকার হারানোর নতুন ঝুঁকি?

১২ মে ২০২৫পড়ুন →

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।