মেরুনপেপার
কালচারাল ফ্যাসিস্টদের মুখোশ, জুলাই বিপ্লববিরোধী প্রোপাগান্ডা এবং বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের নৈতিক সংকট নিয়ে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ।

হতাশার খোয়ারি কালচারাল কলতলায়

জুলাই বিপ্লবের সময় ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের একাংশের ভূমিকা, প্রোপাগান্ডা, নৈতিক পতন ও কালচারাল ফ্যাসিজমের মুখোশ উন্মোচন নিয়ে এই লেখাটি।

পৃথিবীর যে কোন সমাজে সাহিত্য-দর্শন-সংগীত চিত্রকলা চর্চা করা মানুষেরা অপেক্ষাকৃত কোমল মানসিকতার হয়ে থাকেন। কারণ কবিতা-গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-সংগীত-চিত্রকলার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে অর্থকরী হিসাব নিকাশ আর পার্থিব লাভালাভের বাইরে একটা সুন্দর জগতে নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু শিল্প-সাহিত্য-সংগীত চর্চাকারী কালচারাল ফ্যসিস্টের সংঘবদ্ধ দেখা মেলে আমাদের জনপদে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ দেশের শিশু-কিশোর-তরুণদের হত্যা করছে; তখন আওয়ামী লীগের কালচারাল উইং-টি সোল্লাসে উদযাপন করতে শুরু করে সে হত্যাযজ্ঞ।

যে লোকটি আওয়ামী লীগের দেড় দশকে প্রতিদিন সকালে ফেসবুকে ফুলের ছবি পোস্ট করেছে, সিয়েস্তায় যাবার আগে রবীন্দ্র সংগীত পোস্ট করেছে; সাঁঝে আর্ট গ্যালারি পরিদর্শনে গেছে; রাতে নানা সাহিত্য গ্রন্থের প্রচ্ছদ শেয়ার করেছে; যার জগত জুড়ে সুন্দরের আরাধনা; সে জুলাই মাসে এসে খুনী হয়ে ওঠে।

যে মনস্তত্ব জীবনের বিশ-তিরিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে কেবল আর্ট কালচার করেছে; সেই একই মনস্তত্ব কি করে ক্যানিবাল হয়ে ওঠে; এর মনোসমীক্ষণ ও গবেষণার বিষয় হওয়া প্রয়োজন।

অল্প বয়স থেকে শিল্প-সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে যেটুকু কথা বলা ও লেখালেখির দক্ষতা তৈরি হয়েছিলো এসব লোকের; তা চব্বিশের জুলাই পরবর্তী দুই বছরে ব্যবহৃত হয়েছে সন্তান ও অনুজপ্রতিম জুলাই তারুণ্যের দুর্নাম রটাতে।

শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে; তা একজন মানুষের মনের সংকীর্ণতা সরিয়ে ঔদার্য তৈরি করে। কিন্তু কালচারাল ফ্যাসিস্টদের দলবদ্ধ সংকীর্ণতা যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে ফেসবুক পোস্টে, পত্রিকার উপসম্পাদকীয়তে আর টিভি টকশোতে; তা প্রায় অর্ধশতক ধরে চর্চিত শিল্প-সংস্কৃতিকে অর্থহীন করে ফেলেছে।

জুলাই-এ যে তরুণ-তরুণীরা তাদের নিজ নিজ লাইফ স্টাইলের বৈচিত্র্য নিয়ে দেশের ও মানুষের প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো; তাদের সে ঐক্য ভেঙ্গে দিতে নানারকম বিদ্বেষ ও বিভাজনের মন্ত্রপাঠ করেছে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ঐ শিল্প-সংস্কৃতির লোকেরা।

একেবারে নতুন প্রজন্মের লেখক-কবি-গায়ক-গায়িকা-চলচ্চিত্রকার-অভিনয় শিল্পীরা জুলাই বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলো; প্রবীণ প্রজন্মের শিল্প-সংস্কৃতির লোকেরা তাদের নানারকম তকমা দিয়ে অপমানিত করতে চেষ্টা করেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো; ভারত সমর্থিত আওয়ামী লীগের পতন ও শেখ হাসিনার দিল্লিতে পলায়নের পর; ভারতের গদি মিডিয়া ও বিজেপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা যেভাবে জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে; বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কালচারাল ফ্যাসিস্টেরা ঠিক একইভাষায়; একই কৌশলে; একই রকম বিদ্বেষে জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। অনৈতিকতা ও বিশ্বাসঘাতকতার শত ছিদ্র ঝাঁঝর সম্প্রদায়; জুলাই বিপ্লবীদের একটি ছিদ্র অন্বেষণ করতে দলবদ্ধভাবে কাজ করেছে।

যে কোন বিপ্লব ও গণ অভ্যুত্থানের পর একটি দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে সময় লাগে। পৃথিবীর ইতিহাসে এর অসংখ্য নজির রয়েছে। বিশেষ করে পুলিশ ও প্রশাসনকে আওয়ামী লীগ যেভাবে দলীয় সংগঠনে পরিণত করেছিলো; ডিভাইড এন্ড রুল করতে যেভাবে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোকে একদিকে অখণ্ড ভারত আর অন্যদিকে মদিনা সনদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলো, দেশ লুন্ঠনকে যেভাবে সাফল্যের একমাত্র পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো; গুম, হত্যা, ক্রসফায়ার, আয়নাঘর আর গণ গ্রেফতারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে যে ভীতিপ্রদ নরকে পরিণত করেছিলো; তা সমাজ মনস্তত্বে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে; মূল্যবোধের যে ধস নেমেছে; তাতে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে আবার উঠে দাঁড়াতে আরো সময়ের প্রয়োজন।

কালচারাল ফ্যাসিস্টদের মুখোশ, জুলাই বিপ্লববিরোধী প্রোপাগান্ডা এবং বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের নৈতিক সংকট নিয়ে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ।

অথচ প্রকাশ্যে হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধ সমর্থন করা শিল্প-সাহিত্যের জাঢ্য ও জরদগব লোকেরা ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট সন্ধ্যা থেকে ‘জাতির বিবেক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো। মিডিয়ার জলসাঘরে তারা ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করলো। ভারতের গদি মিডিয়া আর বাংলাদেশের বক বিবেক মিডিয়া জমজ ভাইয়ের মতো একই সুরে ‘আগেই ভালো ছিলাম’ গাইতে শুরু করলো।

শিল্প-সাহিত্য করা লোকের অশালীন গালাগালিতে তাদের কালচারাল এক্সরে রিপোর্ট প্রকাশিত হতে থাকলো দুই বছর ধরে। সিপি গ্যাং-এর গালাগালের আসরে এক দশক ধরে প্রশ্রয়ের লাইক দেয়া শিল্প দাদু ও সংস্কৃতি দিদিরা এবার নিজেরাই সিপি গ্যাং হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো।

গণভবনের পিঠাপুলির আসর, প্রশ্ন নয় প্রশংসা করতে এসেছি’র আসর, ওয়েস্টিনে পাপিয়ার আসর থেমে গেলে পড়ে থাকে সাজঘর, জরির পোশাক আর মেয়েটির পরচুলো। শিল্প দাদু ও সংস্কৃতি দিদি যখন ঘুম ভেঙ্গে দেখে, সুখের সমুদ্র শুকিয়ে গেছে; তখন সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিতে ইচ্ছা করে।

সেই সব হতাশার খোয়ারি সিপি গ্যাং-এর গালি হয়ে কালচারাল কলতলায় লুটিয়ে পড়ে।

    Scroll to Top