চুক্তির পটভূমি: কেন এই চুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ?
২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে উন্মোচিত হয় আদানি চুক্তির বীজ। মোদির প্ররোচনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের কোম্পানিগুলিকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রবেশের সুযোগ করে দেন। এরপর আদানি পাওয়ার লিমিটেড এবং বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (BPDB)-এর মধ্যে ২৫ বছরের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রাথমিকভাবে চুক্তি করা হয় ঝাড়খণ্ডে একটি তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং সেখান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করার জন্য। চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করতে সম্মত হয়। তবে, সমস্যা এখানেই শুরু। আদানির বিদ্যুৎ চুক্তির প্রতিটি ধারা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি আদানির জন্য অতি মুনাফা নিশ্চিত করার একতরফা পরিকল্পনা। প্রশ্ন ওঠে, মোদির সফরের মূল এজেন্ডা কি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন, নাকি ভারতীয় কর্পোরেট লবির জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি?মুসকান খানের হিজাব ও ভারতের অসাম্প্রদায়িকতা
গোপন দরপত্র, ‘বিশেষ শর্ত’ ও আদানির মুনাফার সূত্র
কয়লার রহস্যময় খরচ
আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি অনুযায়ী, আদানির ঝাড়খণ্ড বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। সেখানে সুলভ মূল্যের স্থানীয় কয়লা ব্যবহার না করে আদানি ব্যবহার করেন অস্ট্রেলিয়ার কারমাইকেল কয়লা খনি থেকে আমদানি করা কয়লা। চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই কয়লা খনি আদানির নিজস্ব। আর ৮,০০০ কিলোমিটার দূরের এই কয়লার দাম আদানি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে, বাংলাদেশের জন্য কয়লার খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এভাবে পরিবহন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়িয়ে আদানি কৃত্রিমভাবে তার মুনাফা বাড়িয়েছিল, পুরোটাই বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে।দ্বিগুণ বিদ্যুৎ ইউনিট মূল্য
স্থানীয় কয়লা ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ হতো $৪ ডলার। আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করায় এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে $৭ ডলার। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে আদানির খরচ দেখানো হয়েছে প্রতি টন কয়লার জন্য $৪০০ ডলার, যখন বাস্তব দাম ছিল $২৪৫ ডলার। এই কৃত্রিম দাম বৃদ্ধির কারণে, একটি চালানের জন্য বাংলাদেশ বছরে শত কোটি ডলার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।কৃত্রিম কর মওকুফ ও শুল্ক ফাঁকি
আদানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) ঘোষণা করা হয়, যার ফলে কর ছাড়সহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা আদানি গ্রুপ পায়। কিন্তু চুক্তিতে বাংলাদেশের উপর কল্পিত কর পরিশোধের দায়িত্ব আরোপ করা হয়। এভাবে কল্পিত করের নামে বাংলাদেশ থেকে বিলিয়ন ডলার আদায় করা হয়।অযৌক্তিক শর্ত
আদানির বিদ্যুৎ চুক্তিতে এমন শর্ত দেওয়া হয়েছে,- আদানি যেকোনো রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যর্থ হলে তার জন্য কোনো জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। কিন্তু বাংলাদেশ যদি চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে, বা বাংলাদেশে কোনো অস্থিরতার কারণে দেরি হলে বাংলাদেশকে মোটা অংকের জরিমানা দিতে বাধ্য করা হবে, কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে না।
- ভারতের রাজনৈতিক কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার মেরামতের খরচও বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে।
- কয়লার গুণগত মান কম হলেও এর পূর্ণ মূল্য পরিশোধ বাধ্যতামূলক।
- আদানি কর্তৃক সরবরাহকৃত বিদ্যুৎ গ্রহণ না করলেও বাংলাদেশকে এর খরচ পরিশোধ করতে হবে।
মোদি-হাসিনা-আদানি: চোরে চোরে মাসতুতো ভাই
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে গৌতম আদানির সম্পর্ক শুধু ব্যবসায়িক নয়, বরং রাজনৈতিক। মোদি সরকারের ছত্রছায়ায় আদানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবাধে দুর্নীতি করেছে। শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদানি চুক্তির ধরন প্রায় একই। এসব দেশে মোদি আদানির ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য ব্যক্তিগতভাবে তদবির করেছেন। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আদানির বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। আদানিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে $২৫০ মিলিয়ন ডলারের ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে ভারতের নবায়ণযোগ্য জ্বালানি চুক্তি পাওয়ার জন্য। এই ঘুষ কেলেঙ্কারিতে মোদির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
‘আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি তারা তা সারা জীবন মনে রাখবে। প্রতিদিনের বোমাবাজি গুলি থেকে আমরা তাদের শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছি। এটা তাদের মনে রাখতে হবে।’- শেখ হাসিনামোদি- আদানির সম্পর্ক আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন ক্রমবর্ধমানভাবে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক জোটকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই সম্পর্কে শেখ হাসিনার জড়িয়ে পড়েন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই চুক্তি তার রাজনৈতিক শক্ত অবস্থান টিকিয়ে রাখতে ভারতের সমর্থনের ওপর হাসিনার নির্ভরশীলতার প্রতিফলন। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে ভারতীয় আধিপত্যের নিচে রাখার রাজনৈতিক কৌশল। ২০১৮ সালে একটি বৈঠকের মিটিং মিনিটে দেখা যায়, হাসিনা সরকার আদানির প্রস্তাবের অধিকাংশ শর্ত বিনা দ্বিধায় মেনে নেয়।




