ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম ও চরম অসম এক মানবিক বিপর্যয়। ১৯৪৮ সালের বিপর্যয়কর নাকবা (Nakba) থেকে শুরু করে দীর্ঘ সাড়ে সাত দশক ধরে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী সামরিক দখলদারিত্ব, নির্বিচার বাস্তুচ্যুতি এবং যুদ্ধের নিষ্ঠুর শিকার হয়ে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ইসরায়েলের নিজস্ব মানবাধিকার সংস্থা বি'তসেলেম (B'Tselem) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রমাণ করেছে যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি শাসন একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বর্ণবাদী বা 'অ্যাপার্থাইড' (Apartheid) অপরাধের শামিল।
কিন্তু বিশ্ববাসীর মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: কীভাবে একটি রাষ্ট্র প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক আইন, জেনেভা কনভেনশন এবং জাতিসংঘের শত শত প্রস্তাব উপেক্ষা করে কোটি কোটি মানুষকে বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগারে বন্দী রেখে বছরের পর বছর এই বর্বরতা চালিয়ে যেতে পারে? এর নেপথ্যের কার্যকারণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে উগ্র রাজনৈতিক মতাদর্শ, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য এবং পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর নিঃশর্ত পৃষ্ঠপোষকতার যোগসূত্র স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়।

আমেরিকার কুখ্যাত ব্ল্যাকওয়াটার: ভাড়াটে ঘাতক বাহিনী ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসের নেপথ্য ইতিহাস
১৯৬০-এর দশকে প্রত্যক্ষ উপনিবেশ শাসনের অবসান ঘটলেও পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় কীভাবে টিকে রইল ফরাসি প্রভাব? সিএফএ ফ্রাঁ, সামরিক আগ্রাসন, অপেরাসিওঁ বারখান এবং ফ্রাঁসাফ্রিকের নব্য-উপনিবেশবাদী কাঠামোর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।
১. প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ ও পরিকল্পিত জাতিগত নিধন
দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত ও পঙ্গু করে রাখার জন্য এক সুপরিকল্পিত আইনি ও সামরিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে:
- অবৈধ বসতি স্থাপন (Illegal Settlements): পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে আন্তর্জাতিক আইন পদদলিত করে সাত লক্ষাধিক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের উর্বর কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎস কেড়ে নিয়ে তাদের বিচ্ছিন্ন ছিটমহলে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
- গাজা উপত্যকার দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ: ২০০৭ সাল থেকে প্রায় ২৩ লাখ মানুষকে স্থল, নৌ ও আকাশপথে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, যাকে জাতিসংঘ বারবার 'বসবাসের অযোগ্য' উন্মুক্ত কারাগার বলে অভিহিত করেছে।
- নির্বিচার গ্রেপ্তার ও প্রশাসনিক আটকাদেশ: কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক কারাগারে আটকে রাখা এবং ইসরায়েলি সামরিক আদালতে ৯৯ শতাংশের বেশি সাজা প্রদান।
- যৌথ শাস্তি ও মানবিক মৌলিক অধিকার হরণ: সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া, চেকপোস্টের মাধ্যমে চলাচল স্তব্ধ করা এবং সুপেয় পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সম্মিলিত শাস্তি প্রদান।
২. অভ্যন্তরীণ আদর্শিক চালিকাশক্তি: রাজনৈতিক জায়নবাদ
ইসরায়েলের এই দখলদারিত্ব ও আগ্রাসনের মূল দার্শনিক ভিত্তি হলো উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক জায়নবাদ (Political Zionism)। এই মতাদর্শের লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ভূমিতে কেবল ইহুদিদের জন্য একটি একচ্ছত্র জাতিরাষ্ট্র গড়ে তোলা। এর অনিবার্য ফল হিসেবে স্থানীয় ফিলিস্তিনি আরবদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল।
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।

বর্তমান ইসরায়েলি রাজনীতিতে এই মতাদর্শ চরম ডানপন্থী ধর্মীয় উগ্রবাদে রূপ নিয়েছে। ২০১৮ সালে পাস হওয়া 'ইহুদি জাতিরাষ্ট্র আইন' আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে ইসরায়েলে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেবল ইহুদি জনগোষ্ঠীর রয়েছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন চরমপন্থী সরকার পশ্চিম তীর সম্পূর্ণ গ্রাস করার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার ঘোষণা দিয়েছে।
৩. আন্তর্জাতিক পরাশক্তি ও পশ্চিমা বিশ্বের দায়মুক্তির ঢাল
ইসরায়েল যে আন্তর্জাতিক আইনকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে এই ধ্বংসলীলা চালিয়ে যেতে পারছে, তার প্রধান কারণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের অন্ধ সমর্থন:
২০২৩ সালের মে মাসের নির্বাচনে রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের বিজয় তুরস্কের দুই দশকের শাসনকে আরও সুসংহত করেছে। নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, অর্থনৈতিক সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও সামাজিক মেরুকরণের বিশদ পর্যালোচনা।
- বিপুল মার্কিন সামরিক সহায়তা: প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের শর্তহীন সামরিক অনুদান দেয়। এফ-৩৫ ফাইটার জেট, বাংকার ব্লাস্টার বোমা এবং আয়রন ডোমের আধুনিক সামরিক অস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীকে অপরাজেয় করে রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে মোট ১৫৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সামরিক অনুদান দিয়েছে।
- জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্লজ্জ ভেটো: ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ ও অবৈধ বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে যখনই জাতিসংঘ কোনো শাস্তিমূলক প্রস্তাব নিতে চেয়েছে, তখনই ওয়াশিংটন তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে ইসরায়েলকে বিচারের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা করেছে।
- ওয়াশিংটনে শক্তিশালী লবিং নেটওয়ার্ক: এআইপিএসি (AIPAC - American Israel Public Affairs Committee)-এর মতো শতকোটি ডলারের জায়নবাদী লবি গ্রুপগুলো আমেরিকান রাজনীতিবিদ ও আইনপ্রণেতাদের নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারেন না।
- কর্পোরেট ও মিডিয়া আধিপত্য: পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যম এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধকে সন্ত্রাসী তকমা দেয় এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনকে 'আত্মরক্ষা' বলে প্রচার করে বৈশ্বিক জনমতকে বিভ্রান্ত করে।

স্বৈরাচার ও মানবাধিকারের লড়াই: বৈশ্বিক মুক্তির ঐতিহাসিক শিক্ষা
ন্যায্য সমাধানের পথ: দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান
সামরিক হামলা ও ফাঁকা আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে কখনোই টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এই রক্তক্ষয়ী সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন আবশ্যক:
- দখলদারিত্ব ও বর্ণবাদী ব্যবস্থার বিলোপ: ফিলিস্তিনের সমস্ত অবৈধ ইহুদি বসতি উচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের পরামর্শ অনুযায়ী গাজার দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা।
- ফিলিস্তিনিদের সার্বভৌম অধিকার ও প্রত্যাবর্তনের অধিকার নিশ্চিতকরণ: জাতিসংঘের ১৯৪ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের তাদের পৈতৃক ভিটায় ফেরার পূর্ণ অধিকার প্রদান।
- আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (ICC) যুদ্ধাপরাধীদের বিচার: কোনো রাষ্ট্রকে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে না দিয়ে ইসরায়েলি সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের যুদ্ধাপরাধের আন্তর্জাতিক বিচার নিশ্চিত করা এবং পশ্চিমা সামরিক অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা।
উপসংহার
ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বর্বরতা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; এটি এক শতাব্দী প্রাচীন উপনিবেশবাদী দখলদারিত্ব, বর্ণবাদী আইনি শোষণ এবং পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক প্রদত্ত আন্তর্জাতিক দায়মুক্তির সমষ্টিগত পরিণতি। যতক্ষণ না পর্যন্ত বিশ্ব সম্প্রদায় দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্মগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার স্বীকার করবে এবং অন্যায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই মুক্তিকামী জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।



