Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন

তুরস্কের নির্বাচনে এরদোয়ানের বিজয়: স্থিতিশীলতার প্রতীক নাকি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

সারকথা

২০২৩ সালের ২৮ মের ঐতিহাসিক রান-অফ নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল কিলিচদারওগলুকে পরাজিত করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে জয়ী হয়েছেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। এই বিজয়ের ভূরাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রভাবের গভীর বিশ্লেষণ।

রাকিবুল ইসলাম
লিখেছেন:রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশিত: ২৮ মে ২০২৩•পড়তে ৪ মিনিট লাগবে
তুরস্কের নির্বাচনে এরদোয়ানের বিজয়: স্থিতিশীলতার প্রতীক নাকি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

২০২৩ সালের ২৮ মে আধুনিক তুরস্কের ১০০ বছরের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক রচিত হয়। দ্বিতীয় দফার ঐতিহাসিক রান-অফ নির্বাচনে বিরোধী দলীয় প্রার্থী কামাল কিলিচদারওগলুকে ৫২.১৮ শতাংশ ভোটে পরাজিত করে তৃতীয় মেয়াদের জন্য তুরস্কের রাষ্ট্রপতিত্ব নিশ্চিত করেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। এই বিজয়ের মাধ্যমে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তাঁর ক্ষমতা সুনিশ্চিত হয় এবং তিনি আতাতুর্কের পর তুরস্কের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজের অবস্থান পাকা করেন।

নির্বাচনের এই ফল বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এরদোয়ানের অনুসারীদের মতে, চরম অর্থনৈতিক বৈরিতা ও বহুমুখী ভূরাজনৈতিক চক্রান্তের মুখে এই বিজয় জাতীয় স্থিতিশীলতা, সার্বভৌম প্রতিরক্ষা ও ইসলামি ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে বিরোধী শিবির এবং পশ্চিমা গণতন্ত্রকামীদের চোখে এটি তুরস্কের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও বহুত্ববাদী রাজনীতির জন্য এক অশনি সংকেত।

সম্পর্কিত বিশ্লেষণ
এরদোয়ানের পুনঃনির্বাচন: তুরস্কের রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব

২০২৩ সালের মে মাসের নির্বাচনে রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের বিজয় তুরস্কের দুই দশকের শাসনকে আরও সুসংহত করেছে। নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, অর্থনৈতিক সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও সামাজিক মেরুকরণের বিশদ পর্যালোচনা।

রাকিবুল ইসলাম • আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
সম্পূর্ণ পড়ুন →

২০২৩ সালের নির্বাচনের চালচিত্র ও রান-অফ ফলাফল

দুই দশকের শাসনের মধ্যে এটিই ছিল এরদোয়ানের জন্য সবচেয়ে কঠিন নির্বাচনী অগ্নিপরীক্ষা। ৮৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া মূল্যস্ফীতি, বিধ্বংসী ভূমিকম্প এবং ছয়টি বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত 'সিক্স পার্টি টেবিল' জোটের ঐক্যবদ্ধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি। প্রথম দফায় এরদোয়ান ৪৯.৫২ শতাংশ এবং কিলিচদারওগলু ৪৪.৮৮ শতাংশ ভোট পান। পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী নেতা সিনান ওগানের সমর্থন নিয়ে রান-অফে তিনি জয় ছিনিয়ে নেন:

মৌলিক লেখা আহ্বান • CONTRIBUTORS WANTED

মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন

আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।

লেখা জমা দিন →
প্রার্থীদল / জোটভোটের শতকরা হার
রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানপিপলস অ্যালায়েন্স (একে পার্টি / এমএইচপি)৫২.১৮%
কামাল কিলিচদারওগলুন্যাশন অ্যালায়েন্স (সিএইচপি / ইয়ি পার্টি)৪৭.৮২%
জাতীয় ভোটার উপস্থিতি৮৫.৭২%

স্থিতিশীলতার পক্ষে যুক্তি: অর্থনৈতিক রূপান্তর ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা

এরদোয়ানের সমর্থকরা এই বিজয়কে তুরস্কের টেকসই স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি হিসেবে দেখেন তিনটি প্রধান কারণে:

বিশেষ সুপারিশ
পিকেকে-র বিলুপ্তি: তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি কুর্দিদের জন্য নতুন সংকট?

পিকেকে-র বিলুপ্তির ঘোষণা: তুরস্কের সামনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ, নাকি কুর্দিদের জন্য অধিকার হারানোর নতুন ঝুঁকি?

রাকিবুল ইসলাম • ইতিহাস
সম্পূর্ণ পড়ুন →
  1. অবকাঠামোগত বিপ্লব ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন: গত দুই দশকে তুরস্কের মাথাপিছু আয় ৩,৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ১০,০০০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর, মারমারে সমুদ্রগর্ভস্থ রেল টানেল, উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং বিশ্বমানের নগর হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে আনাতোলিয়ার মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় নিয়ে এসেছেন এরদোয়ান।
  2. স্বদেশী সামরিক শিল্প ও সন্ত্রাস দমন: প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশের ওপর নির্ভরতা ৮০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। বায়ারাকতার টিবি-২ ড্রোনের মতো প্রযুক্তি আজারবাইজান, লিবিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। পিকেকে (PKK) এবং আইএসআইএস (ISIS)-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে।
  3. জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন কূটনীতি: ধর্মনিরপেক্ষ উচ্চবিত্ত এলিট ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে তুরস্কের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি সমুন্নত রাখতে এরদোয়ানের নেতৃত্বকে অপরিহার্য মনে করেন সাধারণ ভোটাররা।
আঙ্কারায় এরদোয়ানের বিজয়োৎসব পালন করছেন সমর্থকরা

এরদোয়ানের পুনঃনির্বাচন: তুরস্কের রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব

গণতন্ত্রের সংকট: কর্তৃত্ববাদী শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়

অপরপক্ষে, এরদোয়ানের বিজয়কে তুরস্কের সাংবিধানিক গণতন্ত্রের জন্য গুরুতর হুমকি মনে করার পেছনে সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে:

  • নির্বাহী কর্তৃত্ববাদ ও একনায়কতন্ত্র: ২০১৭ সালের গণভোটের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পদ বাতিল করে সর্বময় কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। সংসদ আজ কার্যকরভাবে ক্ষমতাহীন।
  • বিচার বিভাগ ও বিরোধীদের ওপর দমনপীড়ন: ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের অজুহাতে হাজার হাজার বিচারক, সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে চাকরিচ্যুত করা হয়। কুর্দি নেতা সালাহউদ্দিন দেমিরতাসকে কারাবন্দী রাখা এবং ইস্তাম্বুলের জনপ্রিয় মেয়র একরেম ইমামওগলুর ওপর বিচারিক খড়্গ বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
  • গণমাধ্যমের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ: তুরস্কের মূলধারার ৯০ শতাংশ গণমাধ্যম সরকারপন্থী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে, যা বিরোধী প্রার্থীদের জন্য সমতল নির্বাচনী ক্ষেত্র তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
  • অর্থনৈতিক দুঃশাসন: সুদের হার কম রাখার একগুঁয়ে নীতির ফলে তুর্কি লিরার নজিরবিহীন পতন ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

উপসংহার

রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের এই বিজয় একই সাথে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রতীক এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক পরিসরে একদিকে ন্যাটো সদস্য হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক মিত্রতা, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বশীল শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ—তুরস্কের এই জটিল পথচলা এরদোয়ানের নেতৃত্বের ওপরই নির্ভরশীল। তুরস্কের দ্বিতীয় শতাব্দীর সূচনায় তিনি দেশটিকে প্রবৃদ্ধির চূড়ায় নিয়ে যাবেন নাকি আরও গভীর অর্থনৈতিক সংকটে ফেলবেন, তা আগামী দিনগুলোতেই নির্ধারিত হবে।

রেটিং

(নতুন)

শেয়ার

পাঠকের মন্তব্য ও পর্যালোচনা

(০)
মন্তব্য করতে Google বা Facebook দিয়ে লগইন করা আবশ্যক
রাকিবুল ইসলাম
রাকিবুল ইসলাম

লেখক (Author)

আইন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজতত্ত্বের অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও লেখক। মেরুনপেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

আরও দেখুন →
এরদোয়ানের পুনঃনির্বাচন: তুরস্কের রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাবআন্তর্জাতিক সম্পর্ক

এরদোয়ানের পুনঃনির্বাচন: তুরস্কের রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব

২০২৩ সালের মে মাসের নির্বাচনে রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের বিজয় তুরস্কের দুই দশকের শাসনকে আরও সুসংহত করেছে। নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, অর্থনৈতিক সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও সামাজিক মেরুকরণের বিশদ পর্যালোচনা।

১২ জুন ২০২৩পড়ুন →
পিকেকে-র বিলুপ্তি: তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি কুর্দিদের জন্য নতুন সংকট?ইতিহাস

পিকেকে-র বিলুপ্তি: তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি কুর্দিদের জন্য নতুন সংকট?

পিকেকে-র বিলুপ্তির ঘোষণা: তুরস্কের সামনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ, নাকি কুর্দিদের জন্য অধিকার হারানোর নতুন ঝুঁকি?

১২ মে ২০২৫পড়ুন →
ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বর্বরতার নেপথ্যের মূল কারণ: আদর্শ, বর্ণবাদ ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী সুরক্ষাআন্তর্জাতিক সম্পর্ক

ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বর্বরতার নেপথ্যের মূল কারণ: আদর্শ, বর্ণবাদ ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী সুরক্ষা

ফিলিস্তিনের ভূমিতে শতাব্দীর দীর্ঘ দখলদারিত্ব, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর সংঘটিত পাশবিকতার নেপথ্য চালিকাশক্তি: জায়নবাদী চরমপন্থা, বর্ণবাদী শাসন এবং আমেরিকার নিঃশর্ত সামরিক ও কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা।

১৫ অক্টোবর ২০২৩পড়ুন →
আফ্রিকায় ফরাসি উপনিবেশবাদ: সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও ফ্রাঁসাফ্রিকের বিষাক্ত উত্তরাধিকারইতিহাস

আফ্রিকায় ফরাসি উপনিবেশবাদ: সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও ফ্রাঁসাফ্রিকের বিষাক্ত উত্তরাধিকার

১৯৬০-এর দশকে প্রত্যক্ষ উপনিবেশ শাসনের অবসান ঘটলেও পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় কীভাবে টিকে রইল ফরাসি প্রভাব? সিএফএ ফ্রাঁ, সামরিক আগ্রাসন, অপেরাসিওঁ বারখান এবং ফ্রাঁসাফ্রিকের নব্য-উপনিবেশবাদী কাঠামোর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।

২০ জুলাই ২০২৩পড়ুন →

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।