২০২৩ সালের ২৮ মে এক চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রান-অফ নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি পদে পুনরায় নির্বাচিত হন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে এরদোয়ান আধুনিক তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজের দুই দশকের শাসনকালকে আরও দীর্ঘায়িত করলেন। এরদোয়ানের এই পুনঃনির্বাচন কেবল তুরস্কের অভ্যন্তরেই নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এরদোয়ানের সমর্থকরা এই বিজয়কে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের অভূতপূর্ব সক্ষমতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিরোধী শিবির এবং পশ্চিমা বিশ্লেষকদের শঙ্কা, এই নির্বাচনের ফলে তুরস্কের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল হবে এবং একক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন একচ্ছত্র রূপ লাভ করবে।

তুরস্কের নির্বাচনে এরদোয়ানের বিজয়: স্থিতিশীলতার প্রতীক নাকি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?
২০২৩ সালের ২৮ মের ঐতিহাসিক রান-অফ নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল কিলিচদারওগলুকে পরাজিত করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে জয়ী হয়েছেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। এই বিজয়ের ভূরাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রভাবের গভীর বিশ্লেষণ।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য
২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালের সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে একক নির্বাহী রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির প্রবর্তন করেন এরদোয়ান। ফলে বিচার বিভাগ, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের ওপর রাষ্ট্রপতির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও প্রচারযন্ত্রের একচ্ছত্র ব্যবহার বিরোধী জোটের প্রার্থী কামাল কিলিচদারওগলুর জন্য অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছিল বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেন। এরদোয়ানের পরবর্তী মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হবে তুরস্কের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার, গণমাধ্যমের বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখা।
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
অর্থনৈতিক সংকট: মূল্যস্ফীতি ও সনাতনী নীতির প্রত্যাবর্তন
নতুন মেয়াদের সূচনাতেই এরদোয়ান সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে তুরস্কের ভঙ্গুর অর্থনীতি। বিগত বছরগুলোতে 'সুদ কমালে মূল্যস্ফীতি কমে'—এরদোয়ানের এই অপ্রচলিত আর্থিক নীতির কারণে তুর্কি লিরার ঐতিহাসিক দরপতন ঘটে এবং দেশটির মূল্যস্ফীতি ৮৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ার প্রেক্ষাপটে এরদোয়ান প্রথাগত অর্থনৈতিক সংস্কারে বাধ্য হন। মেহমেত শিমশেককে নতুন অর্থমন্ত্রী এবং অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দিয়ে সুদের হার বৃদ্ধির মতো সনাতনী পদক্ষেপে ফেরা হয়। তবে এই সংস্কার সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কতটা সুরক্ষিত করতে পারবে, তার ওপরই সরকারের ভবিষ্যৎ জনসমর্থন নির্ভর করছে।
ফিলিস্তিনের ভূমিতে শতাব্দীর দীর্ঘ দখলদারিত্ব, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর সংঘটিত পাশবিকতার নেপথ্য চালিকাশক্তি: জায়নবাদী চরমপন্থা, বর্ণবাদী শাসন এবং আমেরিকার নিঃশর্ত সামরিক ও কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা।
পররাষ্ট্রনীতি: ন্যাটো, রাশিয়া ও বহুমাত্রিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন
এরদোয়ানের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় মূলত কৌশলগত লেনদেন ও স্বায়ত্তশাসনের নীতিতে। পূর্ব ও পশ্চিমের সেতুবন্ধনে অবস্থিত তুরস্ক কোনো একক ব্লকের অনুসারী হতে চায় না:
- ন্যাটো ও পশ্চিমাদের সাথে দরকষাকষি: ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও সুইডেনের ন্যাটো সদস্যপদ অনুমোদনের শর্ত হিসেবে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রির নিশ্চয়তা আদায় করে তুরস্ক নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছে।
- ইউক্রেন যুদ্ধে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান: রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করে পুতিনের সাথে লাভজনক জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে আঙ্কারা; আবার একই সাথে ইউক্রেনকে শক্তিশালী বায়ারাকতার ড্রোন সরবরাহ করে এবং ঐতিহাসিক কৃষ্ণসাগর শস্য চুক্তির মধ্যস্থতা করেছে।
- উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর এবং এমনকি সিরিয়ার আসাদ সরকারের সাথে বৈরিতা দূর করে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক স্থিতি নিশ্চিত করেছে।
তুর্কি সমাজের মেরুকরণ ও ভবিষ্যৎ দিশা
এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একে পার্টি) এবং উগ্র-জাতীয়তাবাদী এমএইচপি (MHP)-র নির্বাচনী জোট রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে উসকে দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছে। এর ফলে ধর্মীয়-ধর্মনিরপেক্ষ এবং তুর্কি-কুর্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন আরও গভীর হয়েছে।
সাড়ে ৮ কোটি মানুষের এই বহুত্ববাদী দেশকে এগিয়ে নিতে হলে কুর্দি সংখ্যালঘুদের অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করা জরুরি। তুরস্কের তরুণ প্রজন্মের বিপুল মেধা যাতে দেশ ছেড়ে চলে না যায়, তার জন্য সামাজিক সমতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
উপসংহার
মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের পর আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানই সবচেয়ে প্রভাবশালী ও দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রনায়ক। তবে তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এমন এক সময়ে উপনীত হয়েছে যখন দেশ গভীর অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও সামাজিক বিভাজনে জর্জরিত। বহির্বিশ্বে এক আত্মবিশ্বাসী ও সম্মানিত শক্তি হিসেবে নিজেদের ধরে রাখতে হলে তুরস্ককে ক্ষমতার একক বলয় থেকে বেরিয়ে এসে সমন্বিত উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার পথে হাঁটতে হবে।




