বর্ণবাদী রাষ্ট্র কী?
বর্ণবাদ বা 'অ্যাপার্থাইড' এমন একটি শব্দ, যা ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক জাতিগত বিভাজন ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বর্ণবাদী শাসনামলে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকার এমন সব আইন বলবৎ করেছিল, যা কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের অধিকার, সুযোগ ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের বিশেষ সুবিধা ও ক্ষমতাকে সুসংহত ও সংরক্ষিত করেছিল। এই বর্ণবাদী ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল জাতিগত শ্রেণিবিভাগ, যা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করত এবং বর্ণের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখত।পড়ুন: স্বৈরতন্ত্র এবং মানবাধিকার: স্বাধীনতার চলমান সংগ্রাম
সুতরাং, বর্ণবাদী রাষ্ট্র হলো এমন একটি সরকার বা সমাজ, যা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো প্রাতিষ্ঠানিক জাতিগত বিভাজন ও বৈষম্যের চর্চা করে। এটি এমন একটি রাষ্ট্র, যা এক জাতিগোষ্ঠীর ওপর অন্য জাতিগোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধা ও ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য আইন ও নীতি প্রণয়ন করে এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে সুপরিকল্পিতভাবে নিপীড়ন ও প্রান্তিক করে তোলে।ফিলিস্তিনের হৃদপিণ্ডে বর্ণবাদী ইসরায়েল কীভাবে গঠিত হয়েছে?
বর্ণবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক জাতিগত বিভাজন ও বৈষম্যের ব্যবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। দুঃখজনকভাবে, এই সংজ্ঞাটি ইসরায়েলের বর্তমান পরিস্থিতিকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলে। ইসরায়েলি সরকার ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এই নীতিগুলোর মধ্যে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ, সম্পদের প্রবেশাধিকার সীমিতকরণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ হরণ অন্যতম। ফিলিস্তিনের হৃদপিণ্ডে ইসরায়েলের বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং এর শিকড় অনেক গভীর। ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দীর্ঘ ও জটিল, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় এবং অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে যুক্ত। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা ফিলিস্তিনি জনগণের সম্মতি ছাড়াই সেখানে "ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি" প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে—একটি ইহুদিদের জন্য এবং অন্যটি ফিলিস্তিনিদের জন্য। তবে আরব দেশগুলো ও ফিলিস্তিনি নেতারা এই বিভাজন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেন, যার ফলে ইসরায়েল ও তার আরব প্রতিবেশীদের মধ্যে ধারাবাহিক সংঘাত ও যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়, যা আরবি ভাষায় নাকবা বা "মহাসর্বনাশ" হিসেবে পরিচিত। সেই থেকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূমি দখল এবং ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করা অব্যাহত রেখেছে, যা চলমান সংঘাত ও প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল বর্ণবাদী নীতি বাস্তবায়ন করছে, যার মধ্যে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ, সম্পদের প্রবেশাধিকার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কেড়ে নেওয়ার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ, ভূমি বাজেয়াপ্ত এবং বৈষম্যমূলক আইনের শিকার হতে হচ্ছে, যা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক পরিষেবার সুযোগ সীমিত করেছে। ইসরায়েলের নাগরিকত্ব আইন ইহুদি এবং অ-ইহুদি নাগরিকদের ভিন্ন ভিন্ন অধিকার প্রদান করে, যা দেশটির বর্ণবাদী চরিত্রকে প্রতিফলিত করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং কর্মীরা এই নীতিগুলোর ব্যাপক নিন্দা জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনি জনগণ ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এর নিন্দা জানিয়েছে এবং ইসরায়েলকে তার বৈষম্যমূলক নীতি বন্ধ করে ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এই দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল ইস্যুর সমাধান এখনো অধরা।ইসরায়েলে বর্ণবাদী শাসনের ইতিহাস
৭ মার্চ ২০২৩-এ আল জাজিরার সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী পশ্চিম তীরের জেনিন শহরে অভিযান চালিয়ে অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা এবং ১১ জনকে আহত করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা এএফপি সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন যে, একটি বাড়ি অবরুদ্ধ করে ইসরায়েলি বাহিনী তাতে রকেট নিক্ষেপ করেছে। এই ঘটনা ইসরায়েলের দীর্ঘ বর্ণবাদী ইতিহাসেরই একটি অংশ। ইসরায়েলে বর্ণবাদের শিকড় ফিলিস্তিনি জনগণের বাস্তুচ্যুতি ও প্রান্তিককরণের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে, যার মধ্যে সম্পদের সীমাবদ্ধ প্রবেশাধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা হরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন অন্যতম। জেনিনের সাম্প্রতিক অভিযান ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত হামলার একটি উদাহরণ মাত্র। এই অভিযানে ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১১ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল; একদিকে বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি জনপদগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। গত সোমবার রাতে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা হুওয়ারা গ্রামে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায়। গত সপ্তাহে দুই ইসরায়েলি হত্যার প্রতিশোধ নিতে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস তাণ্ডবের পর এই গ্রামটিতে ফের উত্তেজনা দেখা দেয়। ২০২৩ সালে এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচজন ফিলিস্তিনি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৬৮ জন। কিন্তু এ সবকিছুর শুরু কীভাবে? ইসরায়েলে বর্ণবাদের ইতিহাস একটি জটিল ও অস্বস্তিকর বিষয়, যা অনেক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ১৮০০-এর দশকের শেষভাগে ইহুদি জায়নবাদীরা ফিলিস্তিনে অভিবাসন শুরু করলে ইহুদি ও ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ফলে শতাব্দীকাল ধরে সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও প্রান্তিককরণের ঘটনা ঘটে। এই পরিস্থিতি বর্তমানের নাকবা বা মহাসর্বনাশের দিকে ধাবিত করে। ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল জায়নবাদী আন্দোলনের একটি সুপরিকল্পিত নীতি, যার লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করা। ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি, ঘরবাড়ি ও গ্রাম থেকে উৎখাত করতে জায়নবাদীরা সহিংসতা, জাতিগত নিধন ও গণহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ১৯৪৮ সালের নাকবা বা মহাসর্বনাশের সময় প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের ভিটা থেকে বিতাড়িত করা হয়, যাদের অনেকেই আর ফিরতে পারেনি। ফিলিস্তিনি জনগণের এই বাস্তুচ্যুতি ও প্রান্তিককরণই ইসরায়েলে আজকের বর্ণবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
পড়ুন: মানবাধিকার বলতে কী বোঝায়?
বার্লিন কংগ্রেসের ফলস্বরূপ জার্মানিও ইউরোপের অন্যান্য পরাশক্তিগুলোর অনুসরণে জার্মান সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় কাজ শুরু করে সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়ামের অধীনে।
ইসরায়েলের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর ফিলিস্তিন দখলদারিত্বের ভূমিকা
ফিলিস্তিনের প্রতি ইসরায়েলের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সরাসরি অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র এবং কয়েক দশক ধরে তাদের সামরিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। ১৯৪৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ১৪৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক সহায়তা প্রদান করেছে। এই সহায়তা ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনের ওপর সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করেছে, যা তাদের নিপীড়নমূলক নীতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে, বিশেষ করে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে বছরের পর বছর ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। এই সম্পর্ক ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের বর্ণবাদী নীতি এবং নৃশংস সামরিক অভিযানের সমর্থক হিসেবে অনেকের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সহায়তা প্রদান শুরু করে এবং সেই থেকে ওয়াশিংটন ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছে। কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ১৪৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক সহায়তা দিয়েছে, যা ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের বৃহত্তম সামরিক সাহায্যগ্রহীতা রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এই সহায়তার মধ্যে রয়েছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম, যা ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহার করছে।পড়ুন: মানবাধিকারের ঐতিহাসিক বিবর্তন
অধিকন্তু, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় ইসরায়েলের প্রতি কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ইসরায়েলবিরোধী প্রস্তাবগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বারবার ভেটো দিয়েছে এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দ্বারা ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিন্দিত হওয়ার পরও মার্কিন সরকার প্রায়শই ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে সাফাই গেয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য থেকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে উল্লেখযোগ্য সামরিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। ২০২০ সালে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের দশ বছর মেয়াদী সামরিক সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই অর্থ অধিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, অবৈধ বসতি নির্মাণ এবং গাজা অবরোধে ব্যবহৃত হচ্ছে। ন্যাটোও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং এর অনেক সদস্য দেশ ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা প্রদান করে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ন্যাটোর ভূমিকা রয়েছে। ২০০৪ সালে ন্যাটো ও ইসরায়েল একটি যৌথ রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করে, যার লক্ষ্য ছিল দুই পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এই ঘোষণাপত্রে যৌথ সামরিক মহড়া, সামরিক গোয়েন্দা বিনিময় এবং অন্যান্য ধরণের সহযোগিতার বিধান রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ কেন ইসরায়েলের স্বৈরাচার ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধকে সমর্থন করে?
আন্তর্জাতিক নিন্দা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে সমর্থন জোগানোর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের বিভিন্ন কারণ রয়েছে। অন্যতম প্রধান কারণ হলো কৌশলগত জোট ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অভিযানের জন্য একটি কৌশলগত অবস্থান প্রদান করে। নোয়াম চমস্কি যথার্থই বলেছেন, "ইসরায়েল এমন একটি সামরিকায়িত সমাজ, যা কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অফশোর সামরিক ঘাঁটির মতো।" এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবি রয়েছে, যা ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন রাজনীতি ও নীতিতে বড় প্রভাব বিস্তার করে। আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (AIPAC)-এর মতো সংগঠনগুলো ইসরায়েলকে সমর্থন করার জন্য কংগ্রেসে এবং হোয়াইট হাউসে ব্যাপক তদবির চালায়। ইসরায়েল এবং কিছু পশ্চিমা দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে, যা ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের অন্যতম কারণ। অনেক মার্কিনি ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের বৈরী প্রতিবেশীদের হুমকির মুখে থাকা একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত দেশ হিসেবে দেখেন এবং তাই তারা ইসরায়েলের প্রতি সংহতি অনুভব করেন। যাইহোক, চমস্কির মতে, বাস্তবতা ইসরায়েলের এই ভাবমূর্তির থেকে বহুদূরে। তিনি বলেন, "প্রকৃত ইসরায়েল একটি নৃশংস, সামরিকবাদী রাষ্ট্র, যার মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধের একটি দীর্ঘ ও কলঙ্কিত ইতিহাস রয়েছে।" তবুও, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে যাচ্ছে, যা ফিলিস্তিনিদের নিপীড়নকে স্থায়ী করছে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে।পড়ুন: নোয়াম চমস্কির 'হু রুলস দ্য ওয়ার্ল্ড'?
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
আমেরিকা ও তার মিত্রদের কি বর্ণবাদী ইসরায়েলকে সমর্থনের নীতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত নয়?
ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের বর্ণবাদী দখলদারিত্বকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কয়েক দশক ধরে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অটল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এই সহায়তা ইসরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে ব্যবহৃত হয়েছে, যার ফলে তারা ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর দখলদারিত্ব ও মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রাখতে পেরেছে। ২০১১ সালে, ন্যাটো লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে, যার ফলে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ঘটে। এই হস্তক্ষেপে ইসরায়েল সমর্থন জুগিয়েছিল, কারণ গাদ্দাফি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতেন। এছাড়া, ন্যাটো ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে, যা ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করেছে। ইসরায়েলের বর্ণবাদী দখলদারিত্বের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সমর্থন কেবল নৈতিকভাবে নিন্দনীয়ই নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইনেরও লঙ্ঘন। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন কোনো দখলদার শক্তির বেসামরিক জনগণকে তাদের দখলকৃত ভূখণ্ডে স্থানান্তর নিষিদ্ধ করে, তবুও ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে অবৈধ বসতি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। তাই, ইসরায়েলের বসতি বিস্তার ও দখলদারিত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সমর্থন আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অধিকন্তু, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দাবি করে ইসরায়েলের বর্ণবাদী নীতিকে সমর্থন করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর কপটতার বহিঃপ্রকাশ। যে রাষ্ট্র তাদের জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কোটি কোটি মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে, তাকে সামরিক সহায়তা দিয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দাবি করা অসম্ভব।
মুসলিম রাষ্ট্রগুলো কেন ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীরব?
অনেক মুসলিম রাষ্ট্র ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীরব থাকার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। এর একটি কারণ হলো ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্রদের কাছ থেকে প্রতিশোধের ভয়। এই রাষ্ট্রগুলোর অনেকেই মার্কিন সহায়তা ও সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল, তাই ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বললে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণতির শিকার হতে হতে পারে। এছাড়া, কিছু দেশ ফিলিস্তিন ইস্যুকে মানবাধিকারের পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে, যার ফলে সম্মিলিত পদক্ষেপের অভাব দেখা দেয়।পড়ুন: মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রচার এবং এর প্রক্রিয়া
ইউরোপের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, মধ্যযুগে যখন পুরো মহাদেশটি কুসংস্কার, অপরিচ্ছন্নতা আর অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই আইবেরীয় উপদ্বীপ বা স্পেনের বুকে জ্বলে উঠেছিল এক অনন্য সভ্যতার মশাল। মুসলমানরা এই ভূখণ্ডের নাম দিয়েছিল 'আল-আন্দালুস'।
চলমান সংঘাতের সমাধান কী?
ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও নিপীড়নের প্রতি ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে নানা রূপ নিয়েছে—শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে সশস্ত্র প্রতিরোধ পর্যন্ত। হামাস ও ফাতাহসহ ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে; যেখানে হামাস সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং ফাতাহ আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পক্ষপাতী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনি কর্মী ও সংগঠনগুলো তাদের দাবির সপক্ষে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবাদ ও অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন পদ্ধতি সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিদের মূল বক্তব্য একই: আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং তাদের পৈতৃক ভূমিতে শান্তি ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার দাবি। যাইহোক, যেকোনো সংঘাত বা সমস্যা সমাধানের জন্য সেই সংঘাতের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবির দিকে নজর দেওয়া জরুরি। আমাদের প্রথমে সংঘাতের মূলে যেতে হবে, এর গোড়াপত্তন খুঁজে বের করতে হবে এবং যৌক্তিকভাবে আলোচনা করতে হবে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের যেকোনো সমাধানে উভয় পক্ষকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে এবং কঠিন আপস করতে হবে। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন এবং সবার জন্য ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা প্রয়োজন। অন্যথায়, আমরা ইসরায়েলের মতো একটি বেআইনি, অনৈতিক ও বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থায় আটকা পড়ে থাকব। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভূখণ্ড, সীমানা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে, সমস্যাটি সমাধানের এবং উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি পথ খোঁজার জন্য নানা প্রস্তাব ও প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রাথমিক প্রস্তাব আসে ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের কাছ থেকে, যা ফিলিস্তিনকে ইহুদি ও আরবদের জন্য দুটি আলাদা রাষ্ট্রে বিভক্ত করার আহ্বান জানায়। তবে, আরব রাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনিরা এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তারা একটি একক ও অখণ্ড রাষ্ট্র চেয়েছিল।সমাজের প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার প্রতি প্রতিরোধ: একটি প্যারাডক্স
পরবর্তী বছরগুলোতে ইসরায়েল ও তার আরব প্রতিবেশীদের মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যার মধ্যে ১৯৬৭ সালের 'ছয় দিনের যুদ্ধ' অন্যতম। এর ফলে ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা দখল করে নেয়, যা পূর্বে যথাক্রমে জর্ডান ও মিশরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে, ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (PLO) ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। পিএলও সংঘাতের সমাধানের জন্য দ্বি-রাষ্ট্র নীতিসহ বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেছিল, কিন্তু ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৮ সালে, প্যালেস্টাইন অথরিটি (PA) পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণা দ্বি-রাষ্ট্র নীতির ওপর ভিত্তি করে ছিল, যেখানে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন দুটি আলাদা ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে। সেই থেকে, পিএ ১৯৯০-এর দশকের অসলো চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোসহ ইসরায়েলের সঙ্গে অসংখ্য শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছে। পিএ ধারাবাহিকভাবে পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান, ইসরায়েলি বসতি উচ্ছেদ এবং একটি সার্বভৌম ও কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে আসছে। যাইহোক, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির অব্যাহত বিস্তার এবং গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী ইসলামি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে পিএ-এর কার্যকরভাবে আলোচনার সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদের অভিযোগের কারণে কিছু ফিলিস্তিনি পিএ-এর বৈধতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, পিএ-এর কৌশল নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। কারো কারো মতে, তারা কেবল আলোচনার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য অন্যান্য পথ অনুসরণে যথেষ্ট কাজ করছে না।মুসলিম রাষ্ট্রগুলো কী প্রস্তাব করে?
ফিলিস্তিন ইস্যু সমাধানের জন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন প্রস্তাব ও প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এর একটি হলো আরব শান্তি উদ্যোগ, যা ২০০২ সালে সৌদি আরব প্রথম উত্থাপন করে এবং পরবর্তীতে আরব লিগ তা অনুমোদন করে। এই উদ্যোগে ইসরায়েলকে অধিকৃত অঞ্চল থেকে প্রত্যাহার, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সমস্যার একটি "ন্যায্য সমাধান"-এর আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া, অনেক মুসলিম রাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের, বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় বসবাসকারীদের আর্থিক ও মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কাতার গাজায় কোটি কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে তুরস্ক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করেছে। কিছু দেশ 'বয়কট, ডিভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস' (BDS) আন্দোলনকে সমর্থন করেছে, যার লক্ষ্য হলো ইসরায়েলকে তাদের দখলদারিত্ব ও বর্ণবাদী নীতি বন্ধ করতে চাপ প্রয়োগ করা। তবে, এটি লক্ষণীয় যে মুসলিম বিশ্ব একক কোনো ব্লক নয় এবং ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে তাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কিছু দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে, আবার কেউ কেউ ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত, ফিলিস্তিন ইস্যুর যেকোনো সমাধানে সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।আব্রাহাম অ্যাকর্ডস কি এই সংঘাতের কোনো সমাধান?
২০২০ সালে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), বাহরাইন, সুদান ও মরক্কোর স্বাক্ষরিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বা আব্রাহাম চুক্তি হলো ইসরায়েল ও এই আরব দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ চুক্তি। এই চুক্তিগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যদিও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধান হিসেবে এর কার্যকারিতা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, এই চুক্তির ফলে অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আসতে পারে এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, আবার সমালোচকরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রত্ব ও মানবাধিকারের ইস্যুটিকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এর কঠোর সমালোচনা করেছেন। মূল সমালোচনাগুলোর একটি হলো, এই চুক্তিগুলো ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মূল ইস্যু, যেমন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মর্যাদা ও ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে কোনো কথা বলেনি। কিছু সমালোচক মনে করেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ফিলিস্তিনিদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। তারা যুক্তি দেন যে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে স্বাক্ষরকারী আরব দেশগুলো কার্যকরভাবে ফিলিস্তিনিদের দাবি থেকে সরে এসেছে এবং একটি ন্যায়সংগত সমাধানের জন্য তাদের যে দরকষাকষির সক্ষমতা ছিল, তা হারিয়েছে।নোয়াম চমস্কি: এই শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মুখপাত্র
বিশিষ্ট মার্কিন ভাষাবিদ ও রাজনৈতিক কর্মী নোয়াম চমস্কি এই চুক্তিগুলোর সমালোচনা করে বলেছেন, অংশগ্রহণকারী দেশগুলো ফিলিস্তিনিদের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছে। তিনি যুক্তি দেন যে, এই চুক্তি সংঘাতের মূল কারণগুলোকে সম্বোধন করেনি এবং ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করতে পারে। ডেমোক্রেসি নাও-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে চমস্কি বলেছিলেন: "সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন নিজেদের স্বার্থের অগ্রগতি চায়। তারা ইরানকে হুমকি হিসেবে দেখে এবং এই হুমকি মোকাবিলায় ইসরায়েলের কাছ থেকে সুবিধা পেতে চায়। আর ইসরায়েল নিজেকে এই অঞ্চলে যুক্ত করতে পেরে খুব খুশি, যাতে তারা শক্তিশালী উপসাগরীয় দেশগুলোর সুবিধা পায়।" চমস্কি আরও উল্লেখ করেন যে, এই চুক্তি ফিলিস্তিনিদের চলমান বাস্তুচ্যুতি ও নিপীড়ন রোধে কোনো ভূমিকা রাখে না: "ফিলিস্তিনিদের কী হবে? তারা যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। তারা প্রেক্ষাপটে পড়ে আছে। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এটিই সবসময় করা হয়। তারা সমীকরণের অংশ নয়।" চমস্কি এমনও প্রস্তাব করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করা, যা বর্তমানে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার। তিনি বিশ্বাস করেন, এই সহায়তা ইসরায়েলকে দখলদারিত্ব ও ফিলিস্তিনিদের দমন করার সাহস দেয়। যাইহোক, অনেকে যুক্তি দেন যে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ এবং এটি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরও অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে স্বাক্ষরকারী আরব দেশগুলো ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলি নীতিকে প্রভাবিত করার জন্য ভালো অবস্থানে থাকতে পারে। তবে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে কোনো অর্থবহ অগ্রগতি বয়ে আনবে কি না, তা দেখার বিষয়। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এই চুক্তিগুলো হওয়ার কারণে এবং সেই প্রশাসনকে ইসরায়েলপন্থী ও ফিলিস্তিনবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করায় এর বৈধতা ও দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান কি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের সংঘাতের জন্য উপযুক্ত?
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত সমাধানের জন্য সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান। এই সমাধানে ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে উভয় রাষ্ট্রই শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করবে। অনেক ফিলিস্তিনি ও তাদের সমর্থকরা যুক্তি দেন যে, একটি ন্যায্য ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জনের জন্য দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানই একমাত্র কার্যকর বিকল্প। তাদের মতে, এই সমাধান ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি—উভয় পক্ষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রত্বের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। নোয়াম চমস্কি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে ব্যাপকভাবে লিখেছেন এবং সম্ভাব্য সমাধানের জন্য বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তার অন্যতম প্রস্তাব হলো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান, যা ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের অন্তর্ভুক্ত। চমস্কি যুক্তি দেন যে, এই সমাধানের জন্য ইসরায়েলকে অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহার করতে হবে, অবৈধ বসতিগুলো ভেঙে ফেলতে হবে এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নিজ ভিটায় ফেরার অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তিনি এও পরামর্শ দেন যে, দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা সহজতর করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা পালন করা উচিত। তবে, কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির অব্যাহত বিস্তার এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের খণ্ড-বিখণ্ড পরিস্থিতির কারণে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান আর কার্যকর কোনো বিকল্প নয়। তাদের মতে, 'এক-রাষ্ট্র সমাধান', যেখানে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা একটি একক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একসঙ্গে বসবাস করবে, সেটিই এই সংঘাতের আরও বাস্তবসম্মত ও ন্যায়সংগত সমাধান হতে পারে।সবার জন্য এক-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা কেমন?
কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির অব্যাহত বিস্তার এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের খণ্ড-বিখণ্ড পরিস্থিতির কারণে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান আর কার্যকর কোনো বিকল্প নয়। তাদের মতে, 'এক-রাষ্ট্র সমাধান', যেখানে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা একটি একক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একসঙ্গে বসবাস করবে, সেটিই এই সংঘাতের আরও বাস্তবসম্মত ও ন্যায়সংগত সমাধান হতে পারে। এক-রাষ্ট্র সমাধানের ধারণাটি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বিকল্প হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলে, যেখানে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের সমান অধিকার থাকবে এবং ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থাকবে। যাইহোক, এই সমাধানটি বিতর্কিত এবং উভয় পক্ষ থেকেই প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। অনেক ইসরায়েলি ভয় পান যে, এক-রাষ্ট্র সমাধান ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয়কে হুমকির মুখে ফেলবে এবং ইহুদিদের জন্য স্বদেশ হিসেবে এর অস্তিত্বের অবসান ঘটাবে। অন্যদিকে, অনেক ফিলিস্তিনি সন্দিহান যে ইসরায়েল তাদের সমান অধিকার দেবে কি না এবং তারা মনে করে যে তারা বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হতে থাকবে। এক-রাষ্ট্র সমাধানে পৌঁছাতে হলে উভয় পক্ষকেই ক্ষমতার অংশীদারিত্বের ব্যাপারে একমত হতে হবে এবং একটি গণতান্ত্রিক, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এর জন্য দৃষ্টিভঙ্গির বিশাল পরিবর্তন এবং ছাড় দেওয়ার মানসিকতা ও কঠিন আপস প্রয়োজন।পড়ুন: মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র
এক-রাষ্ট্র সমাধানের কিছু প্রবক্তা যুক্তি দেন যে, সরকারগুলোর ওপর নির্ভর না করে তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলন এবং নাগরিক সমাজের উদ্যোগের মাধ্যমে এটি অর্জন করা সম্ভব। তারা পরামর্শ দেন যে, যৌথ স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার এবং অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে এবং অভিন্ন পরিচিতি গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। শেষ পর্যন্ত, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের যেকোনো সমাধানে উভয় পক্ষকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে এবং কঠিন আপস করতে হবে। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন এবং সবার জন্য ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা প্রয়োজন।


