জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসের পটভূমি
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধারণ করলেও, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনার শাসনে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্রমেই সীমিত হয়ে বাংলাদেশকে একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বাক-স্বাধীনতা হরণ, বিরোধী রাজনীতিক ও নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন, এবং আদালত থেকে প্রশাসন—সবখানেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করা হয়। গণতন্ত্র ধ্বংসের প্রথম লক্ষ্যবস্তু হয় নির্বাচন ব্যবস্থা। নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের বিরোধীবর্জিত নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের "মিডনাইট ভোট ডাকাতি" – প্রতিটি পদক্ষেপই গণতন্ত্রের কফিনে পেরেক ঠুকে দেয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একে স্পষ্টভাবে "ভোটারবিহীন নির্বাচন" হিসেবে আখ্যায়িত করে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর মিথ্যা মামলা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম—এসব হয়ে ওঠে দখলদার সরকারের নিয়মিত অস্ত্র। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া স্পষ্টত দেখায়, বাংলাদেশে "বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড" এবং "গুম" এর ঘটনায় মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছিল। মিডিয়া ও সাংবাদিকতার ওপর কঠোর সেন্সরশিপ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ, এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের ১৬৩তম অবস্থান তারও নিদর্শন। ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থ লোপাট, রাজনৈতিক মহলে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার প্রতারণা—সকল ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়ন বিস্তার লাভ করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ ক্রমাগত দুর্নীতি সূচকে পিছিয়ে পড়তে থাকে। হাসিনা ক্ষমতাকে দুর্নীতিবাজদের দুর্গে পরিণত করেন, যারা তার চারপাশে এক প্রহরীবলয় গড়ে তোলে। হাসিনা নিজেই একটি দুর্নীতিবাজদের দল তৈরি করেন, যারা তার আশেপাশে ঘিরে থাকত এবং কেউ দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসত। হালিশহরের ক্যাসিনো কাণ্ড, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি, ব্যাংক লুটপাট আর শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ছিল এর প্রতীকী উদাহরণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয় রাজনীতির রক্তচক্ষে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম আর "অটোপাস"-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা হয়। ২০২৩ সালে এইচএসসিতে ৯০%-এরও বেশি শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাওয়া – যা শিক্ষাবিদদের মতে এক কাল্পনিক পরিসংখ্যা। এর ফলে দেশে বেকারত্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারত্বের হার ২০২৩ সালে ৫.৫% থেকে বেড়ে ১০% এর কাছাকাছি পৌঁছেছিল, যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। সবচেয়ে ভয়ানক ছিল জাতীয় স্বার্থের বিক্রি। হাসিনা বাংলাদেশকে ভারতের এক ক্লায়েন্ট স্টেটে পরিণত করেন। তিস্তা চুক্তি, এনআরসি-সিএএ ইস্যুতে নীরবতা, ভারতের সাথে সীমান্ত চুক্তি, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের পণ্য পরিবহন – প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে। জাতিসংঘে ভারতের পক্ষে ভোট দেওয়া জনগণের ক্ষোভের চূড়ায় পৌঁছে দেয়।জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসঃ কোটা সংস্কার থেকে জাতীয় অভ্যুত্থান
২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস-এর প্রথম অধ্যায়। রকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে ছাত্র-জনতা রাজপথে নামে। শিক্ষার্থীদের অদম্য আন্দোলনের মুখে সরকার ৪৬ বছরের পুরনো কোটা ব্যবস্থা বাতিল করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের এক রায় সেই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করলে আবার আগুন জ্বলে ওঠে। জুলাই মাসে "বাংলা ব্লকেড" কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রা দেয়। ১৪ জুলাই হাসিনার এক মন্তব্য আন্দোলনকে আরও উত্তপ্ত করেঃ"যদি মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিরা কোটা না পায়, তাহলে কি তা রাজাকারদের নাতি-নাতনিদের দেওয়া হবে?"এই মন্তব্যের প্রতিবাদে ১৫ জুলাই ভোর থেকে সারা দেশে শোনা যায়:
তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!সরকারের নির্দেশে ১৬ জুলাই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে পড়লে রামপুরা, কুরিল, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র সংঘর্ষ বাধে। ২১ জুলাই আপিল বিভাগ সরকারি চাকরিতে ৯৩% মেধাভিত্তিক নিয়োগের নির্দেশ দিলেও ততক্ষণে আন্দোলন কোটা সংস্কারের সীমা পেরিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
সেদিন রামপুরা এলাকায় প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। একই সময়ে, এআইইউবি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং ইউআইইউ-এর শিক্ষার্থীরা কুরিল বিশ্ব সড়ক এবং প্রগতি সরণিতে বিক্ষোভ করে। একই সাথে, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, মোহাখালী এলাকায় সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং উত্তরায় নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভ শুরু করে।




