Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন

যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র?

সারকথা

যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায়শই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই মন্তব্যটি দেশটির সাম্প্রতিক গোপনীয় সামরিক অভিযানসমূহের কার্যকারিতা পর্যালোচনায় সিআইএ-এর একটি প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।

রাকিবুল ইসলাম
লিখেছেন:রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০২৩•পড়তে ৪ মিনিট লাগবে
যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বের অন্যতম প্রধান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র? এটি একটি অত্যন্ত প্ররোচনামূলক বিবৃতি, যা বিশ্বজুড়ে বিস্তর বিতর্ক ও উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। গুপ্ত অভিযান থেকে শুরু করে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ—যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের নানা প্রান্তে অসংখ্য সংঘর্ষে জড়িয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলোকেই আন্তর্জাতিক মহলে সন্ত্রাসবাদের নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত সংজ্ঞা কী এবং বৈধ সামরিক কর্মকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্যই বা কোথায়? এই নিবন্ধে আমরা সেই সব প্রমাণ ও যুক্তির গভীরে প্রবেশ করব যা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে, সেইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও বিশ্বনিরাপত্তার ওপর এই অভিযোগের সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো পর্যালোচনা করব। সমসাময়িক ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও বিতর্কিত এই ইস্যুটির প্রকৃত সত্য উন্মোচনে আমাদের এই যাত্রায় আপনাকে স্বাগত।

যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বের অন্যতম প্রধান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায়শই বিশ্বের প্রধান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই দাবির ভিত্তি হলো গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-এর সাম্প্রতিক কিছু গুপ্ত অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে করা একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন। প্রতিবেদনের ফলাফল থেকে দেখা যায়, এই অভিযানগুলোর সাফল্যের হার ছিল নগণ্য, যে কারণে তাদের নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সিআইএ-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন এমন সব ঘটনার নথিপত্র খুঁজে বের করতে, যেখানে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে সফল হয়েছে; কিন্তু পর্যালোচনায় তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নোয়াম চমস্কির ‘হু রুলস দ্য ওয়ার্ল্ড?’ পড়ুন

নিউ ইয়র্ক টাইমসের ‘সিআইএ স্টাডি অব কাভার্ট এইড ফুয়েলড স্কেপটিসিজম এবাউট হেল্পিং সিরিয়ান রেবেল্‌স’ শিরোনামের নিবন্ধে প্রেসিডেন্ট ওবামার সিআইএ পর্যালোচনা বিষয়ক মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। নিবন্ধটির শুরুতে অ্যাঙ্গোলা, নিকারাগুয়া ও কিউবার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এগুলোর প্রতিটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা পরিচালিত বড় আকারের সন্ত্রাসী অভিযান।
যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বের অন্যতম প্রধান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র? সন্ত্রাসী, সিআইএ, যুক্তরাষ্ট্র, maroonpaper.com
রিগান প্রশাসন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। ওয়াশিংটন দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে হাত মিলিয়ে অ্যাঙ্গোলায় জোনাস সাভিম্বির সন্ত্রাসী ‘ইউনিটা’ (Unita) বাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করেছিল। এমনকি সুনির্দিষ্ট তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে সাভিম্বি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পর এবং দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরও ওয়াশিংটন এই সহায়তা অব্যাহত রেখেছিল। কিউবা দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে এবং এর খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ কিউবান নাগরিকদের। কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা জাতিসংঘ কর্তৃক বারবার নিন্দিত হওয়া সত্ত্বেও তা আজও বলবৎ রয়েছে। ইসরায়েলের সহিংসতাকে আমরা সন্ত্রাসবাদ বলেই অভিহিত করি, কোনো সংঘর্ষ নয় নিকারাগুয়া প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের সন্ত্রাসী যুদ্ধের কবলে পড়েছিল, যা আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক নিন্দিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ‘বেআইনি বলপ্রয়োগ’ বন্ধ করতে এবং বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন তার প্রতিক্রিয়ায় যুদ্ধ আরও তীব্রতর করে এবং ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত একটি প্রস্তাব—যা সব রাষ্ট্রকে (বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রকে) আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছিল—তাতে ভেটো প্রদান করে। সান সালভাদরে ছয়জন জেসুইট যাজকের হত্যাকাণ্ডের দায়ভারও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। সালভাদর সেনাবাহিনীর একটি সন্ত্রাসী ইউনিট এই হত্যাকাণ্ড চালায়, যারা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা প্রশিক্ষিত ও অস্ত্রসজ্জিত ছিল। এই ঘটনাটি আশির দশকে মধ্য আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত সন্ত্রাসী যুদ্ধের চূড়ান্ত রূপ ছিল, যার প্রভাব আজও ‘অবৈধ অভিবাসী’ বিষয়ক প্রতিবেদনে শিরোনাম হয়ে উঠে আসে।

সন্ত্রাসবাদের উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদ উৎপাদনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সিআইএ-এর প্রাক্তন বিশ্লেষক পল পিলার সিরিয়ায় ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার ফলে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভের’ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, এটি জাবহাত আল-নুসরা ও ইসলামিক স্টেটের মতো জিহাদি সংগঠনগুলোকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ‘ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার চালিয়ে জনমত গঠনের সুযোগ করে দিচ্ছে। হস্তক্ষেপ ও গুপ্ত অভিযানের মাধ্যমে ক্ষোভ সৃষ্টির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, যা পরবর্তীতে ‘ব্লোব্যাক’ বা প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ভয়াবহ সহিংসতা ডেকে আনে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যেভাবে ইরাক আক্রমণের বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করেছিল

যুক্তরাষ্ট্র বহু সন্ত্রাসী অভিযানে জড়িত ছিল এবং মনে হচ্ছে আজও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ড ও নীতি বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতা বিস্তারে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে। এই ধরণের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা জরুরি; কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্র ও এর নাগরিকদের প্রতি শুধু ঘৃণা ও বিদ্বেষই তৈরি করে না, বরং অগণিত নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটায় এবং অন্যান্য দেশে বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে আনে। একটি বিশ্বশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নিজ কর্মকাণ্ডের দায়ভার গ্রহণ করা এবং এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যেখানে কূটনীতি ও শান্তিপূর্ণ সমাধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

রেটিং

(নতুন)

শেয়ার

পাঠকের মন্তব্য ও পর্যালোচনা

(০)
মন্তব্য করতে Google বা Facebook দিয়ে লগইন করা আবশ্যক
রাকিবুল ইসলাম
রাকিবুল ইসলাম

লেখক (Author)

আইন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজতত্ত্বের অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও লেখক। মেরুনপেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

আরও দেখুন →
ইরাক আগ্রাসনের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অপপ্রয়াসঅভিমত

ইরাক আগ্রাসনের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অপপ্রয়াস

এই নিবন্ধে ইরাকে মার্কিন-ব্রিটিশ জোটের সামরিক হস্তক্ষেপ, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বরাজনীতিতে এর ধ্বংসাত্মক অভিঘাত এবং এর সুদূরপ্রসারী উত্তরাধিকার পর্যালোচিত হয়েছে। এতে জোটশক্তিগুলোর সংকীর্ণ স্বার্থপরতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতি তাদের চরম ঔদাসীন্যের দিকটি উন্মোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে, ইরাক যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এক নতুন বয়ানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

১৯ মার্চ ২০২৩পড়ুন →
মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের যৌথ প্রতিরক্ষায় যোগদান কেন অপরিহার্য?অভিমত

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের যৌথ প্রতিরক্ষায় যোগদান কেন অপরিহার্য?

মক্কা চুক্তি ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয়েছে, এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ ধরা হবে। বাংলাদেশের যুক্তি সহজ: সীমান্ত হত্যা, পানি আর ট্রানজিট — তিনটিতেই দরকষাকষির জায়গা এখন প্রায় শূন্য। এই লেখার দাবি, একটি যৌথ কাঠামো সেই জায়গাটা ফিরিয়ে দিতে পারে।

২৭ আগস্ট ২০২৬পড়ুন →
দেশ আর ৫ আগস্টের আগে ফিরবে নাঅভিমত

দেশ আর ৫ আগস্টের আগে ফিরবে না

ড. ইউনূস ও তার কিছু উপদেষ্টার সার্বভৌম চিন্তাকে বাংলাদেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠিত আলোকিত সমাজ, ব্যবসায়ী, সিভিল-মিলিটারি বুরোক্র্যাসির সিনিয়র পর্যায়ের লোকরা ও ডিপস্টেট ভারত প্রভুর প্রতি বেয়াদবি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেটি বুঝেই ইউনূস প্রশাসনের যারা নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারে পদপদবি চান, তারা সমঝে চলেছেন। ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত, তারা ঢাকার ভারত ভক্ত কালচারাল সাব-সোসাইটিতে ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন।

৩ জুন ২০২৬পড়ুন →
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় কি বাংলাদেশের জন্য নতুন হুমকি, নাকি পুরোনো শোষণের নগ্ন রূপ?অভিমত

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় কি বাংলাদেশের জন্য নতুন হুমকি, নাকি পুরোনো শোষণের নগ্ন রূপ?

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাউথ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির আসল অংক কী? বাংলাদেশ কি শুধুই ভারতের ডাম্পিং গ্রাউন্ড?

৫ মে ২০২৬পড়ুন →

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।