Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন

ভারতের হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে

সারকথা

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শাসন পতনের পর থেকে ভারতীয় প্রশাসন ও তাদের গণমাধ্যম গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে "হিন্দু নিপীড়নের" একটি গল্প তৈরিতে ব্যস্ত।

রাকিবুল ইসলাম
লিখেছেন:রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশিত: ৫ ডিসেম্বর ২০২৪•পড়তে ৪ মিনিট লাগবে
ভারতের হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শাসন পতনের পর থেকে ভারতীয় প্রশাসন ও তাদের গণমাধ্যম এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় খেঁটে যাচ্ছে। হাসিনাকে দীর্ঘদিন ধরে তাদের কৌশলগত মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এই পতনের প্রতিক্রিয়ায় তারা গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে "হিন্দু নিপীড়নের" একটি গল্প তৈরিতে ব্যস্ত। হাসিনার পতনের পর, তার ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের সাথে জড়িত নির্যাতকদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ জনগণ বিদ্রোহ শুরু করে, যেখানে কিছু নির্যাতিত ব্যক্তি হিন্দু সম্প্রদায়ের হলেও ভারতীয় গণমাধ্যম তাদের রাজনৈতিক পরিচয় উপেক্ষা করে কেবল সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হিসেবে চিত্রিত করছে। এই পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদনগুলো সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিষয়টি তুলে ধরে পশ্চিমাদের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের চরমপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলো এই প্রোপাগান্ডাকে আরও উসকে দিচ্ছে, বিক্ষোভ ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পশ্চিমা দেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, যেমন ভয়েস অব আমেরিকা, জানিয়েছে যে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের হিন্দুরা আগের চেয়ে অনেক নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী। শুরু থেকেই এই প্রশাসন সকল সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের এই মিথ্যাচারই মূল সমস্যা, যা বাংলাদেশের হিন্দুদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ভয় ও উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় হিন্দু মৌলবাদী নেতা চিন্ময় দাসের গ্রেফতার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তোলে। আওয়ামী লীগের কর্মী ও উগ্রপন্থীরা চট্টগ্রামে এক মুসলিম আইনজীবীকে হত্যার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে, যা স্পষ্টতই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হয়। তবে আইনজীবীর শোকাহত পিতা সংযমের আহ্বান জানান, এবং হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় পরিণতিপূর্ণ আচরণ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখে। চার মাস ধরে ভারতীয় গণমাধ্যমের ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে ঢাকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তাদের ক্যাম্পাস গেটে মেঝেতে ভারতীয় পতাকা আঁকিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ জানায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা শুরু করে, আর কলকাতায় সহিংস বিক্ষোভ হয় যেখানে বাংলাদেশের পতাকা পোড়ানো হয় এবং আগরতলায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে আক্রমণ চালানো হয়। বাংলাদেশে হিন্দু নিপীড়নের মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য ভারতীয় সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো ভুয়া খবর ও বিকৃত ছবি প্রচার করছে। ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে মুসলিমদের উস্কে দেওয়া এবং হিন্দুদের উপর আক্রমণ ঘটানোর চেষ্টা করছে। প্রো-হাসিনা হিন্দুদের প্রায়শই ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে ভারতীয় গণমাধ্যম এই ঘটনাগুলোকে চাঞ্চল্যকর করে উপস্থাপন করতে পারে। বাংলাদেশে হাসিনা সরকার টিকিয়ে রাখতে ভারতের এত বিনিয়োগের প্রতিফলনই তাদের এই হতাশা। আঞ্চলিক আধিপত্যের ভ্রান্ত ধারণা ভারতকে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। বাংলাদেশ তাদের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে রয়ে গিয়েছিল, যা ৫ আগস্ট হাসিনার শাসন পতনের পর পাল্টে যায়। ভারতীয় গণমাধ্যমের অস্থির প্রতিবেদন এখন "দ্বিমুখী সাংবাদিকতার" একটি ধারা প্রদর্শন করছে—চাঞ্চল্যকর, কিন্তু বাস্তবতার থেকে বিচ্যুত।

মুসকান খানের হিজাব ও ভারতের অসাম্প্রদায়িকতা

নিজ দেশে ভারত বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে চরমপন্থী হিন্দু এজেন্ডার সঙ্গে লড়াই করছে। মুঘল যুগের মসজিদগুলোর নিচে মন্দির থাকার দাবির মতো অযৌক্তিক দাবিগুলোকেও বিচার বিভাগ সমর্থন করছে। উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহাসিক আজমির শরিফ দরগাহকে প্রাক-ইসলামী যুগের মন্দির হিসেবে দেখার চেষ্টা চলছে। এই মন্দির পুনরুদ্ধারের মোহ সহিংসতা ও ইসলামোফোবিয়াকে তীব্র করেছে। যখন ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন ব্যাপারে নাক গলাতে ব্যস্ত, ভারতে তখন চারজন মুসলিম যুবককে হিন্দু চরমপন্থীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। ধর্মীয় কারণে গরুর মাংস নিষিদ্ধ করার পরেও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গরুর মাংস রপ্তানিকারক হওয়ার এই দ্বিচারিতা ভারতের চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে মৌলবাদ নিয়ে ভারতের অভিযোগগুলো ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। হাসিনা শাসনে বিভক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দেওয়া হয়েছিল ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য, যেখানে মুসলিম ও হিন্দু উভয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে ভারতীয় প্রোপাগান্ডা প্রমাণে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তার বিদায় আরো ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের রূপ দেখিয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায় উগ্রপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করছে।

Secular India and the Nature of its so-called Secularism

মৌলবাদ বিরোধী শক্তি হিসেবে হাসিনার মিথ ভেঙে পড়েছে। এখন হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার দাবিতে একতাবদ্ধ। ফলে, বাংলাদেশকে একটি অনানুষ্ঠানিক উপনিবেশ হিসেবে ধরে রাখার ভারতের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আপাতত, ভারতের হতাশা তাদের গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বক্তৃতায় প্রকাশ পাচ্ছে। ঔপনিবেশিক আচরণে নয়, বরং, ভবিষ্যতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা আবশ্যক।  কেবল তখনই এই দুই প্রতিবেশী প্রকৃত সমতার ভিত্তিতে উন্নতি করতে পারবে। মূল লেখাঃ মাসকওয়াইথ আহসান

রেটিং

(নতুন)

শেয়ার

পাঠকের মন্তব্য ও পর্যালোচনা

(০)
মন্তব্য করতে Google বা Facebook দিয়ে লগইন করা আবশ্যক
রাকিবুল ইসলাম
রাকিবুল ইসলাম

লেখক (Author)

আইন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজতত্ত্বের অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও লেখক। মেরুনপেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

আরও দেখুন →
কেন ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করেছিল তার প্রকৃত কারণঅনুবাদ

কেন ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করেছিল তার প্রকৃত কারণ

কেন ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করেছিল? আন্তর্জাতিক বিচারের হাত থেকে বাঁচতে, গাজার নিপীড়ন থেকে দৃষ্টি সরাতে ও ইহুদি আধিপত্য জাহিরের হতাশাজনক প্রচেষ্টা।

১৮ জুন ২০২৫পড়ুন →
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) পরবর্তী চার বছর টিকে থাকতে পারবে কি?অনুবাদ

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) পরবর্তী চার বছর টিকে থাকতে পারবে কি?

যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার করতে নিয়োজিত বিশ্বের একমাত্র স্থায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

২২ ডিসেম্বর ২০২৪পড়ুন →
ইসরায়েলে বসবাসরত একজন ফিলিস্তিনির জীবন - ডায়ানা বুট্টুর ডায়েরিঅনুবাদ

ইসরায়েলে বসবাসরত একজন ফিলিস্তিনির জীবন - ডায়ানা বুট্টুর ডায়েরি

লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনির মতো আমিও গত সাত মাস ধরে আমার ফোনের দিকে চোখ আটকে রেখেছি, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উপর নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণের ছবি এবং ভিডিও একের পর এক দেখছি।

১৮ অক্টোবর ২০২৪পড়ুন →
ইসরায়েল একটি দস্যু রাষ্ট্র, একে জাতিসংঘ থেকে বহিষ্কার করা উচিতঅনুবাদ

ইসরায়েল একটি দস্যু রাষ্ট্র, একে জাতিসংঘ থেকে বহিষ্কার করা উচিত

কিভাবে ইসরায়েল এখনও জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে থাকতে পারছে? কেন এখনও বহিষ্কৃত হয়নি এমন একটি সংগঠন থেকে, যে সংগঠনটিকে নিরন্তর এবং নির্লজ্জভাবে আক্রমণ এবং অবমূল্যায়ন করছে?

১৬ অক্টোবর ২০২৪পড়ুন →

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।