আদালত কী?
"আদালত" শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ "Court"-এর ভাষিক উৎস অনুসন্ধান করলে একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের সন্ধান মেলে। এই শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত যাত্রা শুরু হয়েছে প্রাচীন ল্যাটিন শব্দ "cohors" (অর্থ: ঘেরা স্থান বা দল) থেকে, যা রূপান্তরিত হয়ে "cōrtem" হয়ে মধ্যযুগীয় ফরাসি ভাষায় "cour" (ঘেরা উঠোন) শব্দের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে এটি ইংরেজি ভাষায় "court" হিসেবে গৃহীত হয়। আদালত হলো রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত সেই বৈধ প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি, অপরাধের বিচার ও আইনি অধিকার রক্ষার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশের সংবিধান ও বিভিন্ন আইনে আদালতের সংজ্ঞা, এখতিয়ার ও কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।আদালত কত প্রকার ও কি কি?
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সংবিধান ও অন্যান্য আইনের ভিত্তিতে গঠিত। আদালতের শ্রেণিবিন্যাস বিচারিক স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আদালতের প্রকারভেদ ও তাদের কার্যক্রম সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:১. সাংবিধানিকভাবে আদালতের শ্রেণিবিভাগ
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) ও নিম্ন আদালতে (Subordinate Court) বিভক্ত। সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগ (হাই কোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ) দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় বিষয়ে সর্বোচ্চ আপিল কিংবা মৌলিক রায় প্রদান করে। নিচে আদালতের শ্রেণিবিভাগ আলোচনা করা হলোঃসুপ্রীম কোর্ট (Supreme Court)
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত হলো সুপ্রীম কোর্ট, সুপ্রীম কোর্টের দুটি বিভাগ- হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপীল বিভাগ। হাইকোর্ট বিভাগ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার প্রাথমিক ও পর্যালোচনামূলক এখতিয়ার রাখে। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে মৌলিক অধিকার রক্ষা, আইন ও প্রশাসনের পর্যালোচনা, এবং সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে, আপীল বিভাগ হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল শুনানি করে থাকে। সংবিধানের ১০৩ ধারায় এর ক্ষমতা বর্ণিত। এটি মৃত্যুদণ্ডসহ গুরুতর শাস্তির আপীল নিষ্পত্তি করে।বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের করণীয়
অধস্তন আদালত (Subordinate Court / District Courts / Lower Courts)
জেলা পর্যায়ে বিচার ব্যবস্থা (অধস্তন আদালত) দুই ভাগে বিভক্ত দেওয়ানি আদালত (Civil Court) এবং ফৌজদারি আদালত। দেওয়ানি আদালত ব্যক্তিগত অধিকার, সম্পত্তি, দেনা-পাওনা, বিবাহ-বিচ্ছেদ ইত্যাদি দেওয়ানি মামলার বিচার করে। জেলা জজ হলেন জেলার প্রধান দেওয়ানি বিচারক, যিনি আপীল ও মূল বিচার উভয়ই করেন। (দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ধারা ৩) । অন্যদিকে, ফৌজদারি আদালত অপরাধমূলক মামলার বিচার করে। এটি বিভিন্ন স্তরের ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা জজ আদালত নিয়ে গঠিত। (ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৬) ।২. মামলার প্রকৃতির ভিত্তিতে শ্রেণিবিভাগ
মামলার প্রকৃতি অনুযায়ী আদালতকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়— ফৌজদারি আদালত (Criminal Court) এবং দেওয়ানি আদালত (Civil Court) ।ফৌজদারি আদালত (Criminal Court)
ফৌজদারি আদালত অপরাধমূলক মামলার বিচার করে। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৬ অনুযায়ী, ফৌজদারি আদালতের কাজ হলো অপরাধের তদন্ত, বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা। ফৌজদারি আদালতের অধীন বিভিন্ন শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও দায়রা জজ আদালত অন্তর্ভুক্ত। মারাত্মক অপরাধ যেমন খুন, ধর্ষণ, এবং ছোটখাটো অপরাধ যেমন পকেটমারী, ছোট লেনদেন জালিয়াতি ফৌজদারি আদালতের বিচার্য বিষয়।দেওয়ানি আদালত (Civil Court)
দেওয়ানি আদালত মূলত ব্যক্তিগত বিরোধ, সম্পত্তির মালিকানা, ঋণ পরিশোধ, বিবাহ-তালাক ইত্যাদি বিষয় নিষ্পত্তি করে। দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ধারা ৯ অনুযায়ী, দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার এমন সব মামলা নিয়ে যা নাগরিক অধিকার, সম্পত্তি ও চুক্তিভিত্তিক বিরোধ সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ জমি দখল নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করা যায়।ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি (Intellectual Property) কি এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ?
৩. কার্যপদ্ধতিভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ
কার্যপদ্ধতিভিত্তিক বাংলাদেশে আদালতগুলোকে প্রাথমিকভাবে বিচারিক (trial) এবং আপিল (appellate) শাখায় ভাগ করা হয়ে থাকে।বিচারিক আদালত (Trial Court)
বিচারিক আদালত বলতে সাধারণত প্রথম দফার আদালত বোঝানো হয়, যেখানে মামলার মূল বিচার হয় (যেমন: জেলা জজ আদালত, দায়রা জজ আদালত, ম্যাজিস্ট্রেট আদালত) ।আপিল আদালত (Appellate Court)
আপিল আদালত হলো সেই আদালত যেখানে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি হয় (যেমন: জেলা জজ আদালত কখনো আপিল আদালতের ভূমিকা পালন করে, সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ) ।সাক্ষ্য কাকে বলে? সাক্ষ্য কত প্রকার ও কি কি?
৪. বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল ও আদালত (Specialized Tribunal)
বাংলাদেশে সাধারণ দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের পাশাপাশি কিছু বিশেষায়িত আদালত ও ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে, যা নির্দিষ্ট আইন ও বিষয়ে দক্ষতা ও গতিশীলতা নিয়ে কাজ করে। এই আদালতগুলো আইন অনুযায়ী গঠিত এবং নির্ধারিত বিষয়ে দ্রুত বিচার প্রদান করে। যেমনঃ- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নারী ও শিশু নির্যাতন (যেমন: ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন) সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলাগুলোর বিচার করে। এটি "নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০" অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
- শ্রম আদালত শ্রমিকদের বেতন, ছাঁটাই, চাকরি পুনর্বহাল, ট্রেড ইউনিয়ন বিরোধ ও শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তি করে। এটি শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ কিছু জেলায় এর কার্যক্রম চালু রয়েছে।
- অর্থঋণ আদালত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি করে। এটি অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
- দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনাল র্নীতির অভিযোগ তদন্ত শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার বিচার করে। এটি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। আদালতকে অনেক সময় "দুদক ট্রাইব্যুনাল" বলা হলেও, এটি মূলত বিশেষ জজ আদালত নামে পরিচিত।
- ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল ভূমি জরিপ বা খতিয়ান সংশোধন সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত। এটি ভূমি প্রশাসন ও জরিপ সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
- মেরিন আদালত অভ্যন্তরীণ নৌপথে সংঘটিত দুর্ঘটনা, জাহাজের ফিটনেস, লাইসেন্স সংক্রান্ত অপরাধ ইত্যাদির বিচার করে। এটি বাংলাদেশ মেরিন আইন, ২০০১ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। তবে বর্তমানে এই আইনকে আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের জন্য নতুন সংশোধনী ও খসড়া আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যেমন বাংলাদেশ মেরিটাইম অঞ্চল আইন, ২০১৮ (খসড়া) এবং ২০২১ সালের সংশোধনী।
- সাইবার ট্রাইব্যুনাল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ অনুযায়ী সংঘটিত সাইবার অপরাধ (যেমন: হ্যাকিং, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, ডিজিটাল হয়রানি) বিচার করে।
FAQ (প্রশ্ন ও উত্তর)
আদালত কী?
উত্তর: আদালত হচ্ছে রাষ্ট্রের বিচারিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সংবিধান ও আইনের আলোকে বিরোধ নিষ্পত্তি ও অপরাধীদের দণ্ড নির্ধারণ করা হয়।বাংলাদেশে আদালত কত প্রকার?
উত্তর: বাংলাদেশে প্রধানত তিন ধরনের আদালত রয়েছে -- সুপ্রীম কোর্ট (হাইকোর্ট ও আপীল বিভাগ),
- জেলা পর্যায়ের আদালত (দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত),
- বিশেষায়িত আদালত ও ট্রাইব্যুনাল।
সুপ্রীম কোর্টের দুই বিভাগ কী কী?
উত্তর: সুপ্রীম কোর্টের দুটি বিভাগ হলো-- হাইকোর্ট বিভাগ (মৌলিক অধিকার রক্ষা ও প্রাথমিক বিচার),
- আপীল বিভাগ (নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল শুনানি)।
দেওয়ানি আদালত ও ফৌজদারি আদালতের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: দেওয়ানি আদালত ও ফৌজদারি আদালতের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো-- দেওয়ানি আদালত ব্যক্তিগত অধিকার, সম্পত্তি, দেনা-পাওনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করে।
- ফৌজদারি আদালত অপরাধমূলক মামলা যেমন চুরি, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি বিচার করে।



