প্ররোচনা (Abetment) কী?
দণ্ডবিধির ১০৭ ধারায় প্ররোচনার সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে অপরাধ সংঘটনে উস্কানি দেওয়া অথবা অপরাধ সংগঠনের উদ্দেশ্যে অন্য এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়াকে প্ররোচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। যদি ওই ষড়যন্ত্রের অনুসরণে এবং অপরাধটি সংঘটনের লক্ষ্যে কোনো কাজ বা বেআইনি বর্জন (illegal omission) সাধিত হয়, তবে প্ররোচনাকারীকে প্ররোচনার দায়ে অভিযুক্ত করা যায়।প্ররোচনার প্রক্রিয়া কীভাবে সংঘটিত হতে পারে?
১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১০৭ ধারা অনুযায়ী, প্ররোচনা অপরাধ সংগঠনের পরোক্ষ অংশগ্রহণের বিভিন্ন রূপকে অন্তর্ভুক্ত করে। উক্ত ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তিনটি উপায়ে কোনো কাজের প্ররোচনা দিতে পারেন:- উস্কানির মাধ্যমে: এই ধরনের প্ররোচনায় কোনো ব্যক্তিকে অপরাধ সংঘটনের জন্য প্ররোচিত বা উৎসাহিত করা হয়। বাক্য, অঙ্গভঙ্গি বা অন্য যেকোনো মাধ্যমের সাহায্যে ব্যক্তিকে অপরাধে ধাবিত করাই উস্কানি।
- ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে: এক্ষেত্রে অপরাধটি সংঘটিত হওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রের ফলস্বরূপ কোনো কাজের সম্পাদন আবশ্যক, যা ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য হয়।
- যেকোনো কাজ বা বর্জনের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত সহায়তার দ্বারা: অপরাধ সংগঠনের সহায়ক হিসেবে কোনো ধরনের সমর্থন, সম্পদ বা সহায়তা প্রদান করা হলে তা সহায়তার মাধ্যমে প্ররোচনা হিসেবে গণ্য হয়।
অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র কী? এর শাস্তি কী?
প্ররোচনাকারী (Abettor) কে?
দণ্ডবিধির ১০৮ ধারা অনুযায়ী প্ররোচনাকারীর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত কাজগুলো করেন তিনিই প্ররোচনাকারী—- অপরাধ সংগঠনের জন্য প্ররোচনা প্রদান।
- এমন কোনো কাজ যা কোনো আইনত সক্ষম ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত হলে অপরাধ বলে গণ্য হতো।
প্ররোচনাকারীর কাজের ব্যাখ্যা যা প্ররোচনার অপরাধ ঘটাতে পারে
- বেআইনি বর্জনের (illegal omission) প্ররোচনা।
- প্ররোচনার অপরাধের ক্ষেত্রে প্ররোচিত কাজটি বাস্তবে সংঘটিত হওয়া কিংবা সেই কাজের কোনো ফলাফল তৈরি হওয়া আবশ্যক নয়।
- এটিও আবশ্যক নয় যে, প্ররোচিত ব্যক্তি আইনত অপরাধ সংগঠনের সক্ষম হতে হবে, কিংবা প্ররোচনাকারীর মতো তারও অভিন্ন অপরাধমূলক মানসিকতা থাকতে হবে।
- যেহেতু প্ররোচনা একটি স্বতন্ত্র অপরাধ, তাই প্ররোচনার প্ররোচনাও একটি অপরাধ।
- ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্ররোচনার ক্ষেত্রে, প্ররোচনাকারীকে যে অপরাধের প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে তা বাস্তবায়নের জন্য ষড়যন্ত্রে সক্রিয়ভাবে লিপ্ত থাকতে হবে এমন নয়; ষড়যন্ত্রে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখাই যথেষ্ট।
আমেরিকার ব্ল্যাকওয়াটার কী? তারা কীভাবে বিশ্বকে ত্রস্ত করে রেখেছে?
প্ররোচনার বিভিন্ন মাত্রায় শাস্তির পরিস্থিতি
শাস্তির ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি বিভিন্ন পরিস্থিতির ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন বিধান নির্ধারণ করেছে।| পরিস্থিতি | শাস্তি |
|---|---|
| প্ররোচনার ফলে প্ররোচিত কাজটি সংঘটিত হয়েছে। (ধারা ১০৯) | প্ররোচিত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি। |
| প্ররোচনাকারীর অভিপ্রায় বা জ্ঞানের চেয়ে ভিন্ন অভিপ্রায়ে কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। (ধারা ১১০) | প্ররোচনাকারীর অভিপ্রায় অনুযায়ী অপরাধটি সংঘটিত হলে যে শাস্তি হতো, সেই শাস্তিই প্রযোজ্য হবে। |
| প্ররোচিত কাজের চেয়ে ভিন্ন কাজ সংঘটিত হয়েছে, যদি তা প্ররোচনার সম্ভাব্য পরিণতি হয়। (ধারা ১১১) কিন্তু ভিন্ন কাজটি যদি মূল কাজের অতিরিক্ত হিসেবে সংঘটিত হয়। (ধারা ১১২) | যেন প্ররোচনাকারী সরাসরি সেই ভিন্ন কাজটিরই প্ররোচনা দিয়েছিলেন, সেই অনুযায়ী শাস্তি হবে। প্ররোচনাকারী উভয় কাজের প্ররোচনার জন্যই শাস্তি পাবেন। |
| প্ররোচিত কাজের ফলাফল প্ররোচনাকারীর অভিপ্রেত ফলাফল থেকে ভিন্ন। যদি প্ররোচনাকারীর জ্ঞান থাকে যে কাজটি ওই ফলাফল ঘটাতে পারে। (ধারা ১১৩) | ভিন্ন ফলাফল ঘটা অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি। |
| কাজটি সংঘটনের সময় যদি প্ররোচনাকারী উপস্থিত থাকেন। (ধারা ১১৪) | তিনি প্ররোচনাকারী হিসেবে নয়, বরং অপরাধী হিসেবে শাস্তি পাবেন। |
| জনসাধারণকে বা ১০ জনের অধিক ব্যক্তিকে অপরাধ সংগঠনের জন্য প্ররোচিত করা। (ধারা ১১৭) | যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ড, যা তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে, অথবা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। |
| যদি প্ররোচিত কাজটি সংঘটিত না হয়— ক. প্ররোচিত অপরাধটি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য হলে। (ধারা ১১৫) খ. যদি অপরাধটি সংঘটিত না হয় কিন্তু এর ফলে কোনো ব্যক্তির শারীরিক ক্ষতি হয়। (ধারা ১১৫) গ. প্ররোচিত অপরাধটি কারাদণ্ডযোগ্য হলে। একই ক্ষেত্রে, যদি প্ররোচিত ব্যক্তি বা প্ররোচনাকারী সরকারি কর্মচারী হন, যার দায়িত্ব হলো অপরাধ প্রতিরোধ করা। (ধারা ১১৬) | ক. যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ড, যা সাত বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং অর্থদণ্ড। খ. যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ড, যা চৌদ্দ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং অর্থদণ্ড। গ. প্ররোচিত অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ কারাদণ্ডের এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয়ই। একই শাস্তি। তবে কারাদণ্ডের মেয়াদ প্ররোচিত অপরাধের সর্বোচ্চ মেয়াদের অর্ধেক পর্যন্ত হতে পারে, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয়ই। |
অপরাধের নকশা গোপন করার মাধ্যমে প্ররোচনা
প্ররোচনার আরেকটি ধরণ হলো “অপরাধ সংগঠনের পরিকল্পনা গোপন করা।” এই সংক্রান্ত বিধানগুলো দণ্ডবিধির ১১৮, ১১৯ এবং ১২০ ধারায় বর্ণিত হয়েছে। এই ধারাগুলোর অধীনে শাস্তির জন্য একটি শর্ত আবশ্যক: অপরাধটি যেন অপরাধ সংগঠনের সুবিধার্থে বা তা সহজতর করার জ্ঞান নিয়ে করা হয়। এই গোপন করার প্রক্রিয়া কোনো কাজ বা বর্জনের মাধ্যমে হতে পারে। এই ধরনের অপরাধের শাস্তি নিম্নরূপ:| পরিকল্পনা | শাস্তি |
|---|---|
| ১. মৃত্যুদণ্ড বা কারাদণ্ডযোগ্য কোনো অপরাধ পরিকল্পনামাফিক সংঘটিত হলে। (ধারা ১১৮) & ২. যদি এক্ষেত্রে গোপনকারী সরকারি কর্মচারী হন, যার দায়িত্ব তা প্রতিরোধ করা। (ধারা ১১৯) & ৩. যদি গোপনকৃত অপরাধটি সংঘটিত না হয়। (ধারা ১১৮) | পরিকল্পনা অনুযায়ী অপরাধটি সংঘটিত হলে, অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি। |
| ৪. কারাদণ্ডযোগ্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে। (ধারা ১২০) & ৫. যদি এক্ষেত্রে গোপনকারী সরকারি কর্মচারী হন, যার দায়িত্ব তা প্রতিরোধ করা। (ধারা ১১৯) ৬. কারাদণ্ডযোগ্য কোনো অপরাধ সংঘটিত না হলে। (ধারা ১২০) & ৭. যদি এক্ষেত্রে গোপনকারী সরকারি কর্মচারী হন, যার দায়িত্ব তা প্রতিরোধ করা। (ধারা ১১৯) | ৪. ওই অপরাধের জন্য নির্ধারিত কারাদণ্ডের এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত অর্থদণ্ড অথবা উভয়ই। ৫. পূর্বের মতো, তবে কারাদণ্ড অর্ধেক পর্যন্ত হতে পারে। ৬. পূর্বের মতো, তবে কারাদণ্ড এক-অষ্টমাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ৭. পূর্বের মতো, তবে কারাদণ্ড এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত হতে পারে। |




