আদালতের এখতিয়ার
এখতিয়ার (Jurisdiction) শব্দের অর্থ হলো কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আইনি সত্তার আইনি ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব। এই শব্দটির উৎস ল্যাটিন ভাষার দুটি শব্দ—‘juris’ (অর্থ: আইন) ও ‘dictio’ (অর্থ: ঘোষণা বা বক্তব্য)। একত্রে, Jurisdiction বা এখতিয়ার বলতে কোনো সত্তাকে আইন প্রয়োগ, বিচারকার্য পরিচালনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রদত্ত আইনগত কর্তৃত্ব-কে বোঝায়।আদালতের এখতিয়ার বা Jurisdiction বলতে কোনো আদালতের আইনি কর্তৃত্ব ও সীমাকে বোঝায়, যা দ্বারা সে নির্দিষ্ট ধরনের মামলা শুনানি, সিদ্ধান্ত প্রদান বা আইনগত প্রশ্ন সমাধানের অধিকার পায়। অর্থাৎ, কোন আদালত কোন ধরনের বিচারিক কার্য সম্পাদন করতে সক্ষম, যেমন-মামলাগ্রহণ, শুনানি, রায় প্রদান বা তত্ত্বাবধানের ক্ষমতাকে আদালতের এখতিয়ার বোঝায়। এটি আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের সীমানা ও ক্ষমতা নির্ধারণ করে, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অনিবার্য অংশ। বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রসিডিউরাল কোডগুলো এখতিয়ারের প্রকার, ভিত্তি ও প্রয়োগ পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। সিভিল প্রসিডিউর কোড ১৯০৮-এর ধারা ৯ অনুসারে, প্রতিটি আদালতের বিষয়গত, আঞ্চলিক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা মামলাই কেবল নিষ্পত্তি করার অধিকার রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন সহকারী জজের আদালত ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যের দেওয়ানি মামলার এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে, যেখানে জেলা জজ আদালতের এখতিয়ার ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। অন্যদিকে, ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড ১৮৯৮-এর ধারা ১৭৯ অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের স্থানভিত্তিক আদালতই এখতিয়ার প্রয়োগ করে থাকে।আদালতের এখতিয়ার কত প্রকার?
আদালতের এখতিয়ারকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়:১. আদি (Original) এখতিয়ার
আদি এখতিয়ার বলতে কোনো মামলা প্রথমবারের মতো শুনানি ও নিষ্পত্তির ক্ষমতাকে বোঝায়। বাংলাদেশের জুনিয়র দেওয়ানি আদালতগুলো (যেমন: সহকারী জজ আদালত) মূলত আদি এখতিয়ার প্রয়োগ করে থাকে। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোও আদি এখতিয়ারের অধিকারী। সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ সংবিধানের ১০১ ধারা অনুযায়ী রিট মামলার ক্ষেত্রে আদি এখতিয়ার প্রয়োগ করে, যা রাষ্ট্রের যেকোনো অঙ্গের সাংবিধানিক লঙ্ঘন রোধে সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়।২. আপীল (Appellate) এখতিয়ার
আপীল এখতিয়ার হলো নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা। জেলা জজ আদালত সহকারী জজের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল গ্রহণ করতে পারে। ফৌজদারি মামলায় সেশনস জজ আদালত ম্যাজিস্ট্রেটের রায় পুনর্বিবেচনা করে। সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল শুনানি করে, যা সংবিধানের ১০৩ ধারা দ্বারা নিশ্চিত।৩. পরিদর্শন (Supervisory) এখতিয়ার
পরিদর্শন এখতিয়ার হলো উচ্চ আদালতের নিম্ন আদালতের কার্যক্রম তদারকি ও সংশোধনের ক্ষমতা। হাইকোর্ট বিভাগ সংবিধানের ১০৯ ধারা অনুযায়ী নিম্ন আদালতের কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে পারে। ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোডের ধারা ৩৯৭-এ সেশনস জজ বা হাইকোর্ট কর্তৃক রেকর্ড তলব করে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তের আইনগত ন্যায্যতা যাচাইয়ের বিধান রয়েছে। এই এখতিয়ার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।এখতিয়ারের ভিত্তিসমূহ
আদালতের এখতিয়ার নির্ধারণে তিনটি প্রধান ভিত্তি বিবেচনা করা হয়:১. বিষয়গত (Subject-matter) এখতিয়ার
প্রতিটি আদালত নির্দিষ্ট ধরনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য গঠিত। কোন আদালত কী ধরনের মামলা দেখবে, তা মামলার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। যেমন: পারিবারিক আদালত বিবাহ, তালাক ও ভরণপোষণের মামলার এখতিয়ার প্রয়োগ করে, অন্যদিকে অর্থঋণ আদালত ঋণ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে। সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ সংবিধানিক ব্যাখ্যা, কোম্পানি আইন ও মেধাসম্পদ সংক্রান্ত মামলার জন্য বিশেষ এখতিয়ার ভোগ করে।২. আঞ্চলিক (Territorial) এখতিয়ার
আদালতের ভৌগোলিক সীমানা এর আঞ্চলিক এখতিয়ার নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, আঞ্চলিক এখতিয়ার বলতে আদালতের অবস্থান বা ক্ষেত্রের মধ্যে সংঘটিত ঘটনা বিচার করার ক্ষমতাকে বোঝায়। সিভিল প্রসিডিউর কোডের ধারা ১৫-২০ অনুযায়ী, মামলার বিষয়বস্তু বা প্রতিবাদীর বাসস্থানভিত্তিক এলাকার আদালতেই মামলা দায়ের করতে হয়। ফৌজদারি প্রসিডিউর কোডের ধারা ১৭৯-এ অপরাধ সংঘটনের স্থানকে আঞ্চলিক এখতিয়ারের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।৩. আর্থিক (Pecuniary) এখতিয়ার
দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে মামলায় আর্থিক মুদ্রা-মূল্য বা দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ অনুযায়ী আদালতের এখতিয়ার নির্ধারিত হয়। যেমন- সহকারী জজ আদালত ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত,যুগ্ম জজ আদালত ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এবং জেলা জজ আদালত ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত মামলা নিষ্পত্তি করতে পারে। এই সীমা অতিক্রম করলে উচ্চতর আদালতে মামলা দায়ের করতে হয়। [caption id="attachment_8027" align="aligncenter" width="689"]
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের ভবন[/caption]
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় বিভিন্ন আদালতের এখতিয়ার
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা একটি স্তরবদ্ধ কাঠামো অনুসরণ করে, যেখানে প্রতিটি আদালতের এখতিয়ার স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত:সুপ্রীম কোর্ট
সংবিধানের ৯৪ ধারা অনুযায়ী সুপ্রীম কোর্টের দুই বিভাগ-আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ-নিজ নিজ ক্ষেত্রে এখতিয়ার প্রয়োগ করে। হাইকোর্ট বিভাগের মূল এখতিয়ারের মধ্যে রয়েছে:- রিট এখতিয়ার: সংবিধানের অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রিট মামলা গ্রহণ।
- আদি এখতিয়ার: কোম্পানি, নৌ ও ট্রেড মার্ক সংক্রান্ত মামলা।
- আপিল এখতিয়ার: নিম্ন আদালতের রায় পুনর্বিবেচনা।
জেলা আদালত
জেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতগুলো সুনির্দিষ্ট এখতিয়ার প্রয়োগ করে:- দেওয়ানি আদালত: সহকারী জজ, যৌথ জজ ও জেলা জজ আদালত আর্থিক সীমা অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি করে।
- ফৌজদারি আদালত: ম্যাজিস্ট্রেট, সেশনস জজ ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী মামলা পরিচালনা করে।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
বিভিন্ন বিশেষ আইনের অধীন গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর এখতিয়ার সুনির্দিষ্ট:- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল: নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার মামলা।
- সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনাল: সন্ত্রাসমূলক অপরাধের বিচার।
- অর্থঋণ আদালত: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি।
আদালতের এখতিয়ার সম্পর্কিত সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
১. আদালতের এখতিয়ার কী?
উত্তর: আদালতের এখতিয়ার বলতে বোঝায় সেই আইনানুগ ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট আদালত নির্দিষ্ট ধরনের মামলা শুনানি, বিচার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। এটি আদালতের বিচারিক ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে, অর্থাৎ কোন আদালত কোন মামলার বিচার করবে তা এখতিয়ার দ্বারা নির্ধারিত হয়।২. আদালতের এখতিয়ারের কত প্রকার আছে?
উত্তর: আদালতের এখতিয়ার প্রধানত তিন প্রকার:- আদি (Original) এখতিয়ার: যেখানে মামলা প্রথমবারের মতো শুনানি হয়।
- আপীল (Appellate) এখতিয়ার: যেখানে নিম্ন আদালতের রায় পুনর্বিবেচনা করা হয়।
- পরিদর্শন (Supervisory) এখতিয়ার: যেখানে উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের কার্যক্রম তদারকি করে।
৩. এখতিয়ারের ভিত্তি কী কী?
উত্তর: আদালতের এখতিয়ার নির্ধারণে তিনটি প্রধান ভিত্তি থাকে:- বিষয়গত (Subject-matter): আদালত কোন ধরনের মামলা শুনতে পারে। যেমন, পারিবারিক আদালত শুধুমাত্র পারিবারিক বিষয় নিয়ে কাজ করে।
- আঞ্চলিক (Territorial): আদালতের ভৌগোলিক সীমা, অর্থাৎ কোন এলাকার মামলা সে শুনতে পারে।
- আর্থিক (Pecuniary): মামলার আর্থিক মূল্য বা দাবির পরিমাণ অনুযায়ী আদালতের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকে।
৪. হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ার কী কী?
উত্তর: বাংলাদেশের সংবিধানের ১০১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, হাইকোর্ট বিভাগের রয়েছে:- আদি এখতিয়ার: যেমন সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট আবেদন গ্রহণ।
- আপীল এখতিয়ার: নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল শুনানি।
- পরিদর্শন এখতিয়ার: নিম্ন আদালতগুলোর কার্যক্রম তত্ত্বাবধান ও নির্দেশ প্রদান।




